দিনাজপুরের মধ্যপাড়ায় অবস্থিত বাংলাদেশের একমাত্র পাথর খনি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালীন এই এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে উত্তর কোরিয়ার নামনাম কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে খনিটি অবকাঠামো ও উন্নয়ন তরান্বিত করেন। তাদের মাধ্যমে খনিটির উৎপাদন শুরু হয়। কিন্তু ঐ কোম্পানিটি খনিটির উৎপাদন বৃদ্ধি করতে না পারায় তাদের সাথে চুক্তি বাতিল করে পরবর্তীতে জার্মানিয়া-টেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)-এর সাথে ২০১৪ সালের চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত ব্যয়ে পাথর উত্তোলন শুরু করে। তারা খনিটির বিভিন্ন অবকঠামো উন্নয়ন করে। যদিও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও খনির শ্রমিকদের ব্যয় বেড়েছে। তারপরেও খনিটির উৎপাদন বৃদ্ধি করছে বেসরকারি কোম্পানিটি।
খনি সূত্রে জানা যায়, মধ্যপাড়া পাথর খনিতে দিন দিন বেড়েই চলেছে পাথরের মজুদ, বন্ধ হয়ে যেতে পারে খনিটি। দিনাজপুরের মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ পাথর বিক্রি না হওয়ায় বড় সংকটে পড়েছে। স্ট্ক ইয়ার্ডে ১৩ লক্ষ টন পাথর জমে থাকায় এক মাসের মধ্যেই খনিটির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ।
খনি সূত্রে জানা গেছে, খনির ২৫টি স্ট্ক ইয়ার্ডে প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টন পাথর অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ৪০-৬০ মিলিমিটার আকারের ব্যালাস্ট পাথর, যা মূলত বাংলাদেশ রেলওয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু রেলওয়ের ক্রয় কমে যাওয়ায় প্রায় ৮ লাখ ৬৭ হাজার টন পাথর বিক্রি হচ্ছে না।
খনি কর্তৃপক্ষ জানান, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে দেশীয় পাথরের পরিবর্তে ভারত ও ভুটান থেকে আমদানিকৃত পাথরের ব্যবহার বেড়েছে। এতে দেশীয় পাথরের বাজারে ভাটা পড়েছে। মধ্যপাড়ার প্রধান ক্রেতা বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। কিংবা এই দুই সংস্থার ক্রয় কমে যাওয়ায় বিক্রি প্রায় স্থবির হয়ে গেছে। সরকার বিভিন্ন উন্নয়মূলক কাজের মন্ত্রণালয়গুলির সাথে সমন্বয় না থাকায় তারা মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহার করছে না।
খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এম জোবায়েদ হোসেন বলেন, উৎপাদনের তুলনায় বিক্রি না হওয়ায় স্ট্ক ইয়ার্ড পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে খুব তাড়াতাড়ি উৎপাদন বন্ধ করতে হতে পারে।
সংশ্লষ্টরা বলছেন সংকটের আরেকটি বড় কারণ পরিবহন সমস্যা। মধ্যপাড়া খনি থেকে ভবানীপুর পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার রেললাইন দীর্ঘদিন ধরে অকেজো পড়ে আছে। রেল লাইনগুলো চুরি হয়ে যাওয়ায় পূনরায় রেল লাইনটি সংস্কার করে পাথর পরিবহণ শুরু করলে কম খরচে পাথর পরিবহন সম্ভব। সড়কপথে পরিবহন ব্যয় বেশি হওয়ায় পাথরের দামও বেড়ে যাচ্ছে, যা আমদানিকৃত পাথরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাধা সৃষ্টি করছে।
জানা গেছে, জিটিসি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এক দশকে খনির উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে কোরিয়ান নামনাম কোম্পানি প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৭০০ টন পাথর উত্তোলন করত, এখন সেখানে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টন পাথর উৎপাদন করছে জিটিসি। এর ফলে ২০১৮-১৯ অর্থ বছর থেকে খনিটি লাভজনক অবস্থায় যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিক্রি কমে যাওয়ায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবার লোকসানে পড়েছে খনিটি।
অন্যদিকে, দেশে উৎপাদিত খনিতে বিপুল পরিমাণ পাথর অবিক্রিত থাকলেও বিদেশ থেকে পাথর আমদানি কমেনি। বাংলাদেশে বছরে পাথরের চাহিদা প্রায় দুই থেকে ২.৫ কোটি টন। এর বড় অংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। ২০২২-২৩ অর্থ বছরে প্রায় দুই কোটি ৪৮ লাখ টন পাথর আমদানি হয়েছে, যার বাজার মূল্য প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরেও প্রায় একই পরিমাণ পাথর আমদানি করা হয়েছে।
মধ্যপাড়ার পাথরের গুণগত মান অনেক ভালো প্রায় ২৫ হাজার পিএসআই চাপ সহ্য করতে সক্ষম। এই পাথরের ব্যবহার বাড়ানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব। সরকার গণপূর্ত, সড়ক ও জনপদ বিভাগ, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে দেশীয় পাথর ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং বৈদেশিক পাথর আমদানি কমাতে হবে। এ ব্যপারে সরকারকে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









