বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিতে সাংস্কৃতিক আবহে জেগে উঠেছে যশোর। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করে জেলার সাংস্কৃতিক কর্মীরা এখন দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন। শহরজুড়ে বইছে উৎসবের আগাম হাওয়া কোথাও চলছে মুখোশ তৈরির কাজ, কোথাও নাচ-গানের মহড়া, আবার কোথাও নাটকের প্রস্তুতি। মঙ্গল শোভাযাত্রা, লোকজ আয়োজন, প্রতীকী শিল্পকর্ম ও বর্ণিল মুখোশ তৈরির মধ্য দিয়ে নতুন বছরের আগমনী বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র।
প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় এবারও যশোরের প্রায় ৩০টির বেশি সাংস্কৃতিক সংগঠন নববর্ষ উদযাপনে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। শহরের চারুতীর্থসহ বিভিন্ন সংগঠনের কর্মশালায় তৈরি হচ্ছে পেঁচা, বাঘ, পাখি, সূর্য, গাছ, রাজা-রানীসহ লোকজ ঐতিহ্যের নানা প্রতিকৃতি। বাঁশ, কাগজ, কাপড় ও রঙের সমন্বয়ে তৈরি এসব শিল্পকর্ম শুধু শোভাযাত্রার সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বরং সমাজের নানা বার্তাও তুলে ধরে। পরিবেশ রক্ষা, সম্প্রীতি, সাম্য, মানবিকতা এসব বিষয়ই প্রতিফলিত হচ্ছে প্রতিটি শিল্পকর্মে।
চারুতীর্থ যশোরের শিক্ষক নীলজয় বলেন, এবারের শোভাযাত্রার মূল ভাবনা ‘প্রকৃতি’। তিনি বলেন, আমরা সূর্য, গাছ, পাখি ও প্রাণীর প্রতিকৃতির মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার বার্তা দিতে চাই। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ ধ্বংসের এই সময়ে মানুষকে সচেতন করাই আমাদের লক্ষ্য। প্রস্তুতির কাজ প্রায় শেষের দিকে, এখন শুধু শেষ মুহূর্তের ছোঁয়া দেওয়া হচ্ছে।
সাংস্কৃতিক কর্মী সীমান্ত হরি জানান, কাজের তো শেষ নেই। তবে আমরা অনেক আগেই প্রস্তুতি শুরু করেছিলাম। তাই এখন বেশিরভাগ কাজ শেষ। শুধু কিছু বড় আইটেম ও ফিনিশিং বাকি আছে। আশা করছি এবারের আয়োজন আরও বড় এবং আনন্দমুখর হবে।
চারুতীর্থ যশোরের সাধারণ সম্পাদক সজল ব্যানার্জী বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও আমরা ব্যাপক আয়োজন করেছি। আমাদের থিম ‘প্রকৃতি’। আমরা চাই মানুষ বুঝুক প্রকৃতি ধ্বংস হলে মানবজাতির অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়বে। শোভাযাত্রার প্রতিটি উপস্থাপনায় এই বার্তাই তুলে ধরা হবে।
বর্ষবরণ শোভাযাত্রার অন্যতম উদ্ভাবক মাহবুব জামাল শামীম বলেন, এবারের প্রতিপাদ্য ‘নিত্য নতুনের অমৃতধারা’। তিনি বলেন, আমরা চাই এই আয়োজনটি হোক সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে একটি সার্বজনীন উৎসব। বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ-সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আমরা শান্তি, সম্প্রীতি ও সবুজ পৃথিবীর বার্তা দিতে চাই।
গত কয়েক বছর ধরে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও যশোরে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। করোনাকালে সীমিত পরিসরে আয়োজন হলেও ২০২২ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে বড় পরিসরে ফিরে আসে উৎসবের প্রাণচাঞ্চল্য। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ব্যাপক জনসমাগমে অনুষ্ঠিত মঙ্গল শোভাযাত্রা যশোরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আরও শক্তিশালী করেছে।
বাংলা নববর্ষ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, ঐতিহ্য ও সাম্যের প্রতীক। এখানে নেই কোনো বিভাজন ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি নির্বিশেষে সবাই একসাথে মিলিত হয় আনন্দে। যশোরের সাংস্কৃতিক কর্মীরা বিশ্বাস করেন, এই উৎসব মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করে এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জাগরণ ঘটায়।
শোভাযাত্রা ছাড়া বাংলা বর্ষবরণ উৎসব যেন কল্পনাই করা যায় না। চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলা নববর্ষের প্রথম প্রহরে আনন্দ শোভাযাত্রা বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। আর এই শোভাযাত্রার সূচনা হয়েছিল যশোর থেকেই যা জেলার মানুষের জন্য গর্বের বিষয়।
জানা যায়, ১৯৮৫ সালে (বাংলা ১৩৯২) চারুপীঠের মাহবুব জামাল শামীম ও হীরণ্ময় চন্দ্রের উদ্যোগে যশোরে প্রথম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ চালু হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে এটি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সময়ের পরিক্রমায় এই শোভাযাত্রা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও লাভ করে ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পায় বাংলাদেশের এই বর্ষবরণ আয়োজন।
চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মাহবুব জামিল শামীম বলেন, আমরা যখন প্রথম শুরু করি, তখনই বলেছিলাম বিভিন্ন অঞ্চল নিজেদের মতো করে নাম দিতে পারবে। মূল বিষয় হলো সংস্কৃতির চর্চা ও বিস্তার। এখন নাম পরিবর্তন হয়েছে, সেটি নিয়ে কোনো বিরোধে জড়াতে চাই না। সংস্কৃতি মানুষকে যুক্ত করে, বিভাজন সৃষ্টি করে না।
এবারের নববর্ষ (১৪৩৩) উদযাপনে যশোরে বর্ণিল আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জেলার ৩২টির বেশি সাংস্কৃতিক সংগঠন শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা করছে। প্রত্যেক সংগঠন নিজেদের স্বকীয়তায় অনুষ্ঠান সাজাচ্ছে। কোথাও তৈরি হচ্ছে বিশাল আকৃতির মুখোশ, কোথাও চলছে গীতিনাট্য, আবার কোথাও চলছে লোকসংগীত ও নৃত্য পরিবেশনার মহড়া।
উদীচী, বিবর্তন, ব্যাঞ্জন যশোর, তির্যক যশোর, পুনশ্চ, চাঁদের হাট, উৎকর্ষ, স্পন্দন, সপ্তসুর, সুরধ্বনি, সুরবিতান, নিত্যবিতানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনে এখন ব্যস্ত সময়। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে মহড়া। পাঁচ শতাধিক সাংস্কৃতিক কর্মী এই আয়োজনকে সফল করতে নিরলস পরিশ্রম করছেন।
উদীচী যশোরের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খাঁন বিপ্লব বলেন, বরাবরের মতো পৌর উদ্যানে উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। এবার সকালে ও বিকালে দুই দফায় আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকবে। আমরা চাই সবাই অংশগ্রহণ করুক এবং এই উৎসবকে সবার উৎসবে পরিণত করুক।
সুরবিতান সঙ্গীত একাডেমির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট বাসুদেব বিশ্বাস জানান, শহরের প্রাণকেন্দ্র টাউন হল ময়দানের শতাব্দীর বটবৃক্ষ তলে আমাদের বড় আয়োজন থাকলেও এবার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারপরও আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। পহেলা বৈশাখে আমাদের কার্যালয়ে সবার জন্য মিষ্টিমুখের ব্যবস্থা থাকবে।
উৎসবকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানান, বর্ষবরণ উৎসবে নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি থাকবে না। শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হবে। সিসিটিভি নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে, যাতে উৎসবটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









