চাঁদপুরের মতলব উত্তরের ১০৭ বছরের ঐতিহ্যবাহী শাহ সোলায়মান লেংটার ওরশ ও মেলা শুরু হওয়ার দ্বিতীয় দিনেই বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। অনুমতি ছাড়াই আয়োজন, মাদকবিরোধী অভিযানে সংঘর্ষ এবং ধর্মীয় বিতর্ক, সব মিলিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, চৈত্র মাসের ১৭ তারিখ উপলক্ষে সাদুল্যাপুর ইউনিয়নের বদরপুর এলাকায় প্রতিবছরের মতো এবারও ওরশ ও মেলার আয়োজন করা হয়। তবে জেলা প্রশাসনের অনুমতি না থাকায় শুরু থেকেই অনিশ্চয়তায় ছিল আয়োজনটি। এরপরও ভক্ত-দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে মেলা জমে উঠলে প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে থাকে।
মেলার উদ্বোধনের দিনই মাদকাসক্ত ও ভবঘুরেদের উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে এবং মাজারের প্রধান খাদেম মতিউর রহমান লাল মিয়াকে কুপিয়ে জখম করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন মেলা বন্ধ ঘোষণা করে এবং উপস্থিত সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে এলাকা ত্যাগের আহ্বান জানায়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা কুলসুম মনি জানান, বিভিন্ন মহলের আপত্তির কারণে এ বছর ওরশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এরপরও আয়োজন শুরু হওয়ায় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় প্রশাসন বাধ্য হয়ে মেলা বন্ধ করে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাজারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে মাদক, অশ্লীল গানবাজনা ও অনৈতিক কার্যকলাপ চলে আসছে।
তবে মাজার সংশ্লিষ্টদের দাবি, মাজারকে ঘিরে যে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে, তা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এসব অপকর্ম বন্ধ করতে গেলেই তারা হামলার শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন খাদেম মতিউর রহমান লাল মিয়া।
এদিকে, ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, মাজারকেন্দ্রিক ওরশকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই মতবিরোধ রয়েছে। বিশেষ করে সুফিবাদী চর্চার সঙ্গে সালাফি ও কট্টর ধারার মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব থাকায় প্রতিবছরই এ ধরনের আয়োজন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ড. জালাল উদ্দিন এমপির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। মাজার কমিটি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী কমিটি গঠন করে অভিযোগগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে আগামীতে নিয়ম মেনে ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ওরশ আয়োজন করা সম্ভব হয়।
উল্লেখ্য, বাংলা ১৩২৫ সালের ১৭ চৈত্র শাহ সোলায়মান লেংটার মৃত্যুবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর এই ওরশ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, যেখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লাখো ভক্ত-অনুসারী অংশ নেন।
কথিত আছে, জীবদ্দশায় শুধু এক টুকরো কাপড় পড়তেন এবং আধ্যাত্মিক নানান কার্যকলাপে মানুষের কাছে শাহ সোলায়মান লেংটা বাবা নামে পরিচিতি পান।
শাহ্ সোলায়মান লেংটার জন্মস্থান কুমিল্লা জেলার বর্তমান মেঘনা থানার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামে। তার বাবার নাম আলা বঙ্গ ভূঁইয়া। তার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন মতলবের বদরপুরের বেলতলী তার বোনের বাড়ীতে। সেখানে থেকে নারায়ণগঞ্জের বক্তাবলী গ্রামে তিনি বিয়ে করেন। অনেকেই দাবী করেন, তার বংশধর এখনও আছে।
প্রতিবছর অগণিত ভক্ত এ ল্যাংটা মেলার আয়োজন করে থাকে। বাংলা ১৩২৫ সালের ১৭ চৈত্র সোলেমান শাহ বেলতলীর বদরপুর তার বোনের বাড়ীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৮ চৈত্র তাকে বদপুরের এই বেলতলীতে (যেখানে মাজার) সেখানে তাকে দাফন করা হয়।
সোলায়মান শাহ্ কাউকে মুরিদ করেননি। তবে যেখানে তিনি ধ্যান করতেন সেই শতবর্ষী বেলগাছটি ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নদী ও স্থলপথে আসা লাখো ভক্ত ও দর্শনার্থীদের বিশাল এক মিলনমেলা হয়ে ওঠে উপজেলার বদরপুর গ্রাম।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









