সারাদেশে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণের পরিকল্পনা করছে সরকার। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বোর্ডভিত্তিক প্রশ্নের মানের তারতম্যের কারণে যে বৈষম্য তৈরি হয়, তা দূর করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১১টায় বরিশাল জেলা শিল্পকলা একাডেমির অডিটোরিয়ামে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, বরিশাল আয়োজিত ‘এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা সুষ্ঠু, সুন্দর ও নকলমুক্ত পরিবেশে সম্পন্ন’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বর্তমানে শিক্ষার্থীরা শুধু দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, তারা আন্তর্জাতিক কমিউনিটির অংশ। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আধুনিক জ্ঞান, প্রযুক্তি ও দক্ষতায় নিজেদের সমৃদ্ধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করা ছাড়া বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, আগামীতে সারাদেশে একক প্রশ্নে পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে সব বোর্ডের শিক্ষার্থীদের জন্য সমতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে তিনি দায়িত্বের জায়গা হিসেবে নয়, বরং এক ধরনের ইবাদতের ক্ষেত্র হিসেবে দেখেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় আমার উপাসনালয়; এটি সদকায়ে জারিয়ার মতো একটি কাজ। দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর উন্নয়নের মধ্য দিয়েই জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হবে, যোগ করেন তিনি।
ড. মিলন বলেন, দেশের বিপুল জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা শুধু জাতীয় পর্যায়েই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারব, উল্লেখ করেন তিনি।
শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ নীতি বাস্তবায়নের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণানুযায়ী ভবিষ্যতে জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হবে, যা শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সভায় তিনি আরও বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প পরিচালকরা (পিডি) কোনো ধরনের অনিয়ম বা গাফিলতির মাধ্যমে পার পাবেন না। প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।
পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাশের হার শূন্য হলেও আপাতত এমপিও বাতিল করা হবে না। তবে এটি শুধুমাত্র চলতি বছরের জন্য বিশেষ বিবেচনায় দেওয়া একটি সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শিক্ষকদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদানে অধিক মনোযোগী হতে হবে, বলেন তিনি।
নকলমুক্ত পরীক্ষা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মন্ত্রণালয় নিজ খরচে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসিটিভি) স্থাপনের ব্যবস্থা করবে। এমসিকিউ পরীক্ষার পুরো সময়জুড়ে ভিডিও ফুটেজ সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হবে, যাতে পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।
শিক্ষকদের কল্যাণ নিয়েও কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করে বলেন, পূর্ববর্তী সরকার শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর-সুবিধা বোর্ডের প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা অপব্যবহার করেছে। এর ফলে শিক্ষকরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তিনি আশ্বাস দেন, বর্তমান সরকার শিক্ষকদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ইউনুস আলী সিদ্দিকী। তিনি বলেন, সুষ্ঠু ও নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
এছাড়া সভায় বক্তব্য রাখেন বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার, বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন, বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. তৌফিক আলম, জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমান, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন এবং বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মিয়া মো. নুরুল হক।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা একক প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণের প্রস্তাবকে সময়োপযোগী আখ্যা দিয়ে ইতিবাচক মতামত প্রদান করেন। তাদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও মানোন্নয়ন ঘটবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









