সারা দেশের ন্যায় রাজশাহীতেও জ্বালাতির তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এক মাস পার হয়ে গেলেও এখনো স্বাভাবিক হয়নি জ্বালানি তেলের সরবরাহ। তেল না পেয়ে গাড়ি চালকেরা পড়েছে অসহনীয় দূর্ভোগে। পেট্রোল ও অকটেন পাবার আশায় অনেকে সারারাত ফিলিং স্টেশনগুলোতে তাদের যানবাহন সিরিয়ালে রাখছেন। মশার কামড় আর ঘুমহীন রাত পার হচ্ছে সড়কেই। আর দিনের বেলায় সঙ্গে ছাতা রাখলেও সূর্যের তাপে গরমে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার জেরে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষমাণ ক্রেতা ও ফিলিং স্টেশনের কর্মচারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
দু থেকে তিন দিন পরপর প্রতি ফিলিং স্টেশনে তেল দেওয়া হচ্ছে। এতে করে সংকট আরো বেশি দেখা দিয়েছে। ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ দাবি করছেন তাদের প্রয়োজনীয় মোতাবেক ডিপো থেকে তেল পাচ্ছেন না। সেজন্য তারা প্রতিদিন তেল বিক্রিও করতে পারছে না।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সকালে সরেজমিনে রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে গেলে দেখতে পাওয়া যায়, তেলের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেকে সময়মতো তেল পাচ্ছেন না। অতিরিক্ত ভিড় ও সীমিত সরবরাহের কারণে পাম্প কর্তৃপক্ষ অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল দিচ্ছে না। ফলে একদিকে যেমন অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে।
ভুক্তভোগী চালকরা জানান, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তারা নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না। বিশেষ করে গণপরিবহন ও ভাড়ায় চালিত যানবাহনের চালকদের আয়-রোজগারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দ্রুত এই সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন সাধারণ মানুষ।
এদিন ভূগরইলে রানা ফিলিং স্টেশনে তেল দেওয়া হলেও মোটরসাইকেলের সিরিয়াল গিয়ে ঠেকেছে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে বায়া শিশু সদনের সামনে।
সিরিয়ালে দাঁড়ানো মোটরসাইকেলের চালক ফরিদ উদ্দিন হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “টাকা দিয়ে তেল নিবো, তারপরেও তেল পাচ্ছি না। গত ৫ দিন আগে ৬ ঘন্টা সিরিয়ালে দাড়িয়ে তিনশ টাকার তেল পেয়েছিলাম। সেগুলো শেষ পর্যায়ে, তাই আজকে আবার সিরিয়ালে দাড়িয়েছি। জানি না কখন তেল পাবো। এ ধরণের দূর্ভোগ যাতে খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায় সেই আশাই করছি।”
একই কথা জানিয়ে রাব্বি নামের আরেক চালক বলেন, “এভাবে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে আমাদের যে সময় নষ্ট হচ্ছে, তা কি সরকার দেখছে না। দেশে নাকি পর্যাপ্ত তেল মজুত আছে। তাহলে আমরা তেল পাচ্ছি না কেন। সরকার আমাদের এভাবে হয়রানি করাচ্ছে কেন।”
রাজশাহী বিমানবন্দরের সামনে অবস্থিত মের্সাস হাবিব ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার রাকিব হোসেন বলেন, “আমাদের পাম্পে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল প্রয়োজন তা আমরা ডিপো থেকে পাচ্ছি না। আবার তেলের সরবরাহও স্বাভাবিকভাবে দিচ্ছে না তারা। আমরা যে ভাবে তেলের সরবরাহ পাচ্ছি সেভাবেই তেল বিক্রি করছি। অনেক গাড়ি চালক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল নেওয়ার জন্য প্রতিদিন সিরিয়াল ধরছেন, এতে সাধারণ ক্রেতারা তেল পাচ্ছেন না।”
আফরিন ফিলিং স্টেশন ম্যানেজার মো. ফারুক জানিয়েছেন চাহিদার তুলনায় তেলের সরবরাহ একেবারেই অপ্রতুল। স্বাভাবিক সময়ে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল তারা এক সপ্তাহে বিক্রি করতেন, বর্তমান এই সংকটময় পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত চাহিদার চাপে তা মাত্র এক বেলাতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক গ্রাহককে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে, যা থেকে অসন্তোষ ও সংঘর্ষের সূত্রপাত হচ্ছে।
এদিকে রাজশাহীতে পেট্রোল অকটেনের তুলনায় ডিজেলের সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে চালকদের।
দূরপাল্লার ট্রাক-বাসের চালকরা জানিয়েছেন, তেল না পেয়ে তারাও ভাড়া ধরা কমিয়েছে। তেল পাওয়ার পরেই নতুন করে ভাড়া ধরছেন। অনেকে আবার তেল না পাওয়ার ফলে গাড়িই বন্ধ রাখছেন। এতে করে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাদের।
নওদাপাড়া ট্রাক টার্মিনালে কথা হয় ট্রাক চালক জসিম আলীর সাথে। তিনি জানান তেল না পাওয়ার কারণে অনেক ভাড়া ছেড়ে দিতে হচ্ছে।
জমিস আলী বলেন,“গত পরশুদিন একটি ভাড়া পেয়েছিলাম ১৬ হাজার টাকার। কিন্তু আমার গাড়িতে তেল না থাকায় সেই ভাড়াটি ছেড়ে দিয়েছি। এভাবে চলতে থাকলে তো আমরা বাঁচবো না। আমাদের পরিবার আছে, নিজস্ব খরচ আছে। এভাবে আর কতদিন চলবে?”
রাজশাহী জেলা সড়ক পরিবহণ মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলাল বলেন, “তেল সংকট আমাদের পরিবহণের উপরে অনেক প্রভাব ফেলেছে। শুধুমাত্র তেলের সংকটের কারণে ১০টি গাড়ির ভিতরে ৫টি গাড়িই বন্ধ থাকছে। আমরা সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছি, অতিদ্রুত সময়ের ভিতরেই এ সমস্যা সমাধান করার জন্য।”
ডিপো থেকে চাহিদানুযায়ী তেল পাচ্ছে না জানিয়ে রাজশাহী পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি মমিনুল হক বলেন, ‘‘তেল উত্তোলনকারী কোম্পানি বা ডিপো থেকে চাহিদানুযায়ী তেল পাচ্ছেন না। আমাদের হাতে তেল নেই, তাই আমরা গ্রাহকদের দিতে পারছি না। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আমাদের কিছুই করার নেই।’’
পদ্মা অয়েল কোম্পানি পিএলসির সহকারী মহাব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘‘আগে পাম্পগুলোয় যে তেল সরবরাহ করা হতো, এখনো প্রায় কাছাকাছি পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু চাহিদা বহুগুণ বেড়ে গেছে। সে কারণে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। এ সংকটের কারণে বিপিসি দৌলতপুর থেকে তেল দিতে পারছে না। আমরাও আর ওয়াগনের সুবিধা কাজে লাগাতে পারছি না। এখন ডিলারদের তিনগুণ ব্যয়ে সড়কপথে তেল আনতে হচ্ছে।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









