ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের রিশখালি গ্রামে রয়েছে বিপ্লবী বাঘা যতীনের পৈতৃক ভিটা। ১৮৭৯ সালের ৭ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া জেলার কয়া গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা বাঘা যতীন। তাঁর ছেলেবেলার অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়েছে জেলার হরিণাকুণ্ডুর রিশখালি গ্রামে। শৈশবেই বাঘা যতীনের পিতৃবিয়োগ ঘটে।
ইতিহাস ঘেটে জানা যায়, যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, তিনি বাঘা যতীন নামেই সমধিক পরিচিত। শৈশব থেকেই শারীরিক শক্তির জন্য বিখ্যাত ছিলেন যতীন্দ্রনাথ। বাঘা যতীন নামের সাথে তাঁর সাহসিকতার একটি ঘটনা জড়িত আছে। একবার কয়াগ্রামে গিয়েছিলেন যতীন্দ্রনাথ। সেই সময় গ্রামে বাঘের খুব উৎপাত ছিল। বাঘের আক্রমণে ধস্তাধস্তি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে বাঘ হত্যাসহ দেশমাতৃকার জন্য আত্মনিবেদনে বাঘা যতীন পরিচয়কে সার্থকতা দিয়েছেন। পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে যতীন উপস্থিত হলেন তাঁর পৈতৃক ভিটা ঝিনাইদহে।
ঠিকাদারের ব্যবসা শুরু করলেন যশোর-ঝিনাইদহ রেলপথ নির্মাণ উপলক্ষে। ব্যবসার সুবাদে তিনি সাইকেলে অথবা ঘোড়ার পিঠে চড়ে জেলায়-জেলায় অবিশ্রাম ঘুরে গুপ্তসমিতির শাখাগুলোকে সন্নিহিত করে তুললেন। তখন ১৯১১ সাল চলছে। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বিপ্লবের কৌশল পরিবর্তন করেন যতীন। সপরিবারে ফিরে আসেন ঝিনাইদহ পিতৃনিবাসে। শুরু করেন ব্যবসা। ব্রিটিশ সরকার ভাবে যতীন শুধরে গেছে। এই সুযোগটা পুরোপুরি কাজে লাগান। বাংলার বিপ্লবীদের সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে থাকেন। তখন তার চিন্তা সমগ্র ভারত নিয়ে। নরেন সন্ন্যাসী ছদ্মনামে সমগ্র ভারতে ঘুরে ঘুরে বিপ্লবীদের একত্রিত করতে থাকেন তিনি। এভাবে কাটে আরো দুই বছর। বাঘা যতীন বাংলার সন্ত্রাসবাদী বৈপ্লবিক আন্দোলনের এক বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। তাঁর প্রচেষ্টায় তৎকালীন নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া, যশোর জেলাভুক্ত ঝিনাইদহসহ দেশজুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে বিপ্লবী দলের কার্যক্রম ব্যাপকতা লাভ করে।
তিনি ছিলেন সর্বভারতীয় যুগান্তর দলের প্রধান নেতা। বাঘা যতীন ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্বের অন্যতম নায়ক। ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন, যা তাঁকে বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের অন্যতম প্রধান নেতা। সম্মুখযুদ্ধে উড়িষ্যার বালেশ্বরে তিনি গুরুতর আহত হন এবং বালাসোর হাসপাতালে ১৯১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। জার্মানি থেকে অস্ত্রাদি ভর্তি জাহাজ পৌঁছে গেলে ১৯১৫-১৯১৭-এর মধ্যে স্বাধীন ভারতের অভ্যূদয়ের ঘটনা ইতিহাসে স্থলাভিষিক্ত হওয়ার প্রবল সম্ভবনা ছিল। ত
বুও বাংলা ও বাঙালি তথা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অন্যতম মহানায়ক বাঘা যতীনের বীরোচিত অকাল মৃত্যু একইসাথে বিপ্লবী উত্থান আশঙ্কায় উপবেশিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিতকে দূর্বল করে ফেলে। এই অগ্নিপুরুষের নিজ গ্রামে তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে নেওয়া হয়নি কোন উদ্যোগ। পৈতৃক ভিটায় অরক্ষিত একটা ম্যুরাল ব্যতীত বাঘা যতীনের কোনো স্মৃতিচিহ্ন অবশিষ্ট নেই। রিশখালি গ্রামের পৈতৃক ভিটায় স্মারক স্তম্ভে মৃত্যু তারিখও ভুল লেখা হয়েছে।
বিপ্লবী বাঘা যতীনের পৈতৃক ভিটায় কোন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ কিংবা ইতিহাস সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেই। শৈশবের স্মৃতি আর ইতিহাসের নিদর্শন বর্তমানে সবটুকুই বেদখলে, রিশখালিই ছিল বাঘা যতীনের শৈশব ও প্রথম যৌবনের শিক্ষালয়। তাঁর চরিত্রে দেশপ্রেম, সাহস, মানবিকতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার শক্ত ভীত তৈরি হয়েছিল এই গ্রামে বেড়ে ওঠার সময়। কিন্তু আজ সেই পৈতৃক ভিটায় নেই বাড়ির সুস্পষ্ট চিহ্ন। ভিটে ঘেরা ঝোপঝাড় আর একটি পুরনো জমির সীমানাই কেবল জানান দেয়-এখানে কোনো এক সময় ইতিহাসের এক মহান বিপ্লবী বাস করতেন। স্থানটিতে নেই কোনো তথ্যফলক, নেই স্মৃতিস্তম্ভ বা জাদুঘর। পথ নির্দেশক বোর্ডও নেই; বাইরে থেকে এলে চেনা যায় না এটি বীরযোদ্ধা শহীদ বাঘা যতীনের জন্মভিটা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৮৭ সালে স্থানীয় কয়েকজন যুবক চাঁদা তুলে ৬ শতক জমি ক্রয় করে সেখানে তাঁর স্মৃতি রক্ষায় 'বাঘা যতীন ক্লাব' গড়ে তোলে। পরবর্তীতে এলাকার উৎসাহী ব্যক্তিবর্গ ও জেলা প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় 'বিপ্লবী বাঘা যতীন একাডেমি’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুললেও সঠিক তদারকি ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সেটিও অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে বিপ্লবী বাঘা যতীনের পৈতৃক বসত ভিটা। নবগঙ্গা নদীর তীরঘেঁষে ছায়া সুনিবিড় পরিবেশে শৈশবে ওই গ্রামেই বাবা উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, মা শরৎশশী ও বোন বিনোদ বালার স্নেহে বেড়ে ওঠেন এই বীর সন্তান। বাবার মৃত্যুর পাঁচ বছর পর মা ও বড় বোনের সঙ্গে কুষ্টিয়ার কয়া গ্রামে মামাবাড়ি চলে যান বাঘা যতীন।
ইতিহাসবিদদের মতে, বাঘা যতীন শুধু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নয়, উপমহাদেশের বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম শক্তিশালী নাম। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশের গৌরবময় এক অনন্য নাম। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা যুগান্তর দল, ট্রাম্প কার্ড পরিকল্পনা, ওল্ডাসার সংঘর্ষ-সবকিছুই ব্রিটিশ শাসন কাঠামোর বিরুদ্ধে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। বিপ্লবী বাঘা যতীন একাডেমির সহ-সাধারণ সম্পাদক ও দৌলতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু কালাম আজাদ বলেন, ‘বিপ্লবী বাঘা যতীন স্মরণে রাষ্ট্রীয় কিংবা জেলা-উপজেলা প্রশাসনের কোনরূপ কর্মসূচি না থাকার উদাসীনতা ও অবহেলার শিকারে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে ইতিহাসের স্মৃতিবিজড়িত রিশখালী গ্রাম। বেদখলের শিকার এ গ্রামের ২৫০ বিঘার অধিক জমিসহ বিপ্লবী বাঘা যতীনের পৈতৃক বাড়ি আজ কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। দেশপ্রেমিক এ বিপ্লবী নেতা নামে স্মৃতি কেন্দ্রসহ মেডিকেল ও হাসপাতালসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ঐতিহাসিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে।’
স্থানীয় ও গ্রামবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি, বহুবার প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এমনকি জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যক্তি প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে কোনো উন্নয়ন হয়নি। স্থানীয়রা জানান, ‘বাঘা যতীনের পৈতৃক ভিটা সংরক্ষণের জন্য অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। রিশখালিতে বাঘা যতীন স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, জাদুঘর, গবেষণা কেন্দ্র, লাইব্রেরি, সেমিনার, আলোচনা অনুষ্ঠান, রিশখালি গ্রামকে ‘বাঘা যতীন স্মৃতি গ্রাম’ হিসেবে ঘোষণা, পাঠ্যবইয়ে বাঘা যতীনের বীরত্বের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করতে পারলে টিকে থাকবে বাঘা যতীনের স্মৃতি। শুধু তা-ই নয়, এসব উদ্যোগ নিলে তরুণ প্রজন্মের দেশপ্রেম, মানবিকতা ও ত্যাগের মূল্যবোধ আরও জোরদার হবে।’
আব্দুর রশিদ নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘বাঘা যতীনের মতো স্বাধীনতার মহান নেতার জন্মভিটা বছরের পর বছর অযত্নে পড়ে থাকতে দেখে খুবই কষ্ট হয়। ইতিহাস সংরক্ষণে সরকারের স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’ রিশখালি গ্রামের আরেক বাসিন্দা মঈন আহমেদ বলেন, ‘স্থানটি সংরক্ষণ করা গেলে প্রতি বছর দেশ-বিদেশের গবেষক, দর্শনার্থী ও শিক্ষার্থীরা এখানে আসতে পারেন। এতে রিশখালির অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









