কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার পশ্চিম ফিলিপনগর গ্রামে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে দাফন সম্পন্ন হয়েছে দরবারের প্রধান কালান্দার বাবা শামীম জাহাঙ্গীরের (৫০)।
রবিবার (১২ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৫ টার সময় দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর পশ্চিম - দক্ষিণ ফিলিপনগর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে সীমিত পরিসরে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সম্ভাব্য উত্তেজনা এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
দাফনে পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের উপস্থিতি থাকলেও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল অনুষ্ঠিত হয়। তবে স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার কেউ কিছু বলতে চাই নাহ, কেউ আবার পুরো ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। বিতর্ক, সমালোচনা ও উত্তেজনার মধ্য দিয়েই শেষ হলো এক বহুল আলোচিত জীবনের অধ্যায়।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন:
মোঃ শামীম রেজার জন্ম কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রামের ইসলামপুর এলাকায়। তার বাবা মৃত জেসের মাস্টার ছিলেন স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করতেন। বড় ভাই শান্টুও একই পেশায় যুক্ত ছিলেন। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে শামীম রেজা ছিল চার নম্বার।
শিক্ষক পরিবারে জন্ম নেওয়ায় শামীমের শিক্ষাজীবনের ভিত্তি ছিল সুদৃঢ়। তিনি ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে ১৯৮৪ সালে ফিলিপনগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর কুমারখালী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ভেড়ামারা কলেজ থেকে বি.কম সম্পন্ন করেন। তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান রাজধানীতে। ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে অর্জন করেন এম.কম ডিগ্রি । একজন শিক্ষিত যুবক হিসেবে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারের ছিল অনেক আশা-প্রত্যাশা।
চাকরি থেকে আধ্যাত্মিক জীবনে:
পড়ালেখা শেষ করে শামীম রেজা ঢাকার জিনজিরা এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মধ্যেই হঠাৎ তার জীবনে বড় পরিবর্তন আসে।
একপর্যায়ে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন এবং ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকায় অবস্থানরত কথিত পীর গোলাম-এ-বাবা কালান্দার জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরীর মুরিদ হন। সেখানেই খাদেম হিসেবে বসবাস শুরু করেন। এই সময় শামীম রেজা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন দীর্ঘদিন। বহু চেষ্টা করেও তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি কেউ।
ব্যক্তিগত জীবন :
২০০৭ সালে শামীম রেজা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে তার দাম্পত্য জীবন স্থায়ী হয়নি বলে জানা যায়। বিয়ের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সংসার ভেঙে যায়। এরপর তিনি আর পারিবারিক জীবনে ফিরে আসেননি বলেও জানা গেছে।
গ্রামে প্রত্যাবর্তন ও আস্তানা গড়ে তোলা
প্রায় দুই বছর আগে হঠাৎ করেই শামীম রেজা নিজ গ্রাম ইসলামপুরে ফিরে আসেন। দীর্ঘদিন পর তার এই প্রত্যাবর্তন স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহলের সৃষ্টি করে।
গ্রামে ফিরে বাবার জমির ওপর নিজের আস্তানা গড়ে তোলেন। এ সময় তার চেহারা ও জীবনধারায় বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় মুখভর্তি লম্বা দাঁড়ি, গেরুয়া পাঞ্জাবি, ভিন্নধর্মী আচরণ। ধীরে ধীরে তার আস্তানাটি ‘কালান্দার বাবার শামীম জাহাঙ্গীর দরবার শরীফ’ নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে।
উত্থান:
প্রথমদিকে এলাকাবাসী তাকে তেমন গুরুত্ব না দিলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অনুসারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। অনেকের মতে স্থানীয় ও বাইরের মিলে ১০০ অধিক বিভিন্ন বয়সের ভক্ত অনুসারী আস্তানায় দিন-রাত আনাগোনা করত।অনুসারীদের কাছে তিনি এক ধরনের আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি পান। তার দরবারকে কেন্দ্র করে প্রতি বৃহস্পতিবার নিয়মিত তার রীতি অনুসারে আয়োজন ও কার্যক্রম চলতে থাকে।
বিতর্ক ও অভিযোগ:
স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, শামীম রেজা ও তার অনুসারীরা প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত ছিলেন। বছর বছর পরিবর্তন করতেন তার রূপ। কখন বাবা, কখন যীশু, কখনও কৃষ্ণ একেক সময় আবির্ভাব হত একেক রূপ। প্রথমে শামীম বাবা নামে পরিচিত হলেও সবশেষ চার-পাঁচ মাস আগে তিনি দাড়ি - গোফ কেটে কালান্দার বাবা শ্রী শামীম জাহাঙ্গীর রুপে আবিভূত হন। অনেকের মতে এবার কৃষ্ণ রুপে আসেন তিনি। তবে তার বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম, আল্লাহ ও নবী-রাসুল সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করার অভিযোগ আছে অনেক দিন ধরে।
এর আগে ২০২১ সালে একটি দাফনকে কেন্দ্র করে তার কর্মকাণ্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনার পর থেকেই তাকে ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হতে থাকে। তখন থেকে আলোচনায় এসে একের পর বির্তকের জন্ম দেয় এই শামীম রেজা।
সবশেষ ১০ এপ্রিল শুক্রবারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি ভিডিও, যেখানে শামীম রেজাকে ধর্মীয় বিষয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করতে শোনা যায় বলে দাবি করা হয়। ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে গেলে এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে, যা শেষ পর্যন্ত সহিংস রূপ নেয়।
ঘটনার দিন:
ঘটনার দিন দুপুরে বিক্ষুব্ধ জনতা তার আস্তানা ঘেরাও করে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। একপর্যায়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
এ সময় শামীম রেজাসহ দরবারে থাকা কয়েকজনের ওপর হামলা চালানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
রবিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দীন বলেন, ধর্ম অবমাননার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশে প্রচলিত আইনের মাধ্যমে এর সুষ্ঠু বিচার হওয়া উচিত। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে সহিংসতা ঘটেছে, তা মোটেই কাম্য নয়। ভবিষ্যতে যাতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এলাকায় অবস্থান করছে। তিনি আরও বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
এ ঘটনার এখনও কোন মামলা ও কোন আসামী আটক হয়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









