কয়েকদিনের বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলার হাওরগুলোতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে শতশত হেক্টর ফসলী জমি তলিয়ে গিয়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জলাবদ্ধতায় বিভিন্ন হাওরে ফসল কাটতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে হাওরের কৃষকরা। এছাড়াও ফসলী জমিতে জলাবদ্ধতা থাকায় ধান কাটার হারভেস্টারসহ কোনো ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
শ্রমিক সংকটে থাকায় কৃষকরা এখন ধান কাটা নিয়ে বিপাকে পড়েছে। কৃষকদের এসব দুর্ভোগের মধ্যে আবার প্রত্যেকটি উপজেলায় মাইকিং করে পাউবোর পক্ষ থেকে দ্রুত ধান কাটার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। অথচ অনেক হাওরেই পাউবোর অপরিকল্পিত বাঁধের ফলে জলবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে দুর্ভোগে রয়েছে কৃষকরা।
পাউবোর এমন নির্দেশনাকে হাওরবাসী এখন দায়সাড়া কাজের বাস্তবায়িত রুপ দেওয়ার জন্য ধান্দাবাজি বলে আখ্যা দিয়েছেন।
কাঁচা ধান দ্রুত কাটার এমন নির্দেশনায় ক্ষুব্ধ হয়ে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এড. আব্দুল হক জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এক মতবিনিময় সভায় বলেন, “পাউবোর আকাম-কুকাম জায়েজ করার জন্য দ্রুত ধান কাটার নির্দেশনা দিয়ে কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। নিজেদের দুর্নীতি ও দুর্বল কাজের দায়ভার কৃষকদের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।”
এদিকে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে সুনামগঞ্জে অতিভারী বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা দেখা দেওয়ার মাইকিং করে প্রচারণায় চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে। ফসল রক্ষায় যেসব জমির ধান ৮০ শতাংশ পেকেছে, তা আগামী ২৮ এপ্রিলের মধ্যে দ্রুত ঘরে তোলার জন্য কৃষকদের প্রতি জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) ও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগ-১ -এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, আগামী ২৩ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল তথা সুনামগঞ্জ এবং এর উজানে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টিপাতের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২৪ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিপাত হলেও ২৭ এপ্রিল থেকে বৃষ্টির তীব্রতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। ২৮ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই অঞ্চলে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার ফলে সুরমা, কুশিয়ারা, ধনু-বউলাই ও কংস নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ২৮ এপ্রিল থেকে কোথাও কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে আকস্মিক বন্যায় হাওরের বোরো ফসলের বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
ধান কাটার ত্বরান্বিত করতে জেলায় বর্তমানে ৬০২টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও ১৪৬টি রিপার মেশিন মাঠে কাজ করছে। এছাড়া বিভিন্ন জেলা থেকে আরও ২৫টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার আনা হয়েছে। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকাল পর্যন্ত জেলায় প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “আমরা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সর্বোচ্চ সতর্ক করছি। ৮০ শতাংশ পাকা ধান দ্রুত কাটার জন্য তাদের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। তবে এ বছর প্রকৃতি কৃষকদের সঙ্গে বৈরী আচরণ করছে, যা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। হারভেস্টার ও রিপার মেশিনের পাশাপাশি শ্রমিকদের নিয়ে আমরা ধান কাটার কাজ পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছি।”
পাউবো জানিয়েছে, বর্তমানে সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর পয়েন্টে বিপৎসীমার ১.৭৬ মিটার নিচে রয়েছে। তবে ২৮ এপ্রিল থেকে পরিস্থিতি অবনতির দিকে যেতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় নজরদারি বাড়িয়ে দিয়েছে এবং কৃষকদের ধৈর্য ও সাহসিকতার সঙ্গে দ্রুত ফসল ঘরে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









