এক সময় যে নদীর ঢেউয়ের ছন্দে ঘুম ভাঙত বিশ্বনাথবাসীর, বুক চিরে চলত ছোট-বড় পণ্যবাহী নৌকা। এ নদী দিয়েই নৌকায় পণ্য পরিবহন করতেন স্থানীয় বণিকেরা। সেই স্রোতঃস্বিনী বাসিয়া নদী আজ মরা খাল। কোথাও কোথাও নালার মতো বয়ে গেছে। দখল-দূষণের বিষবাষ্পে প্রাণ গেছে শত বছরের পুরনো নদীটির। শুধু তাই নয় শতবর্ষী এই নাদীটি এখন নিজের ‘জাত’ হারাতে বসেছে; দখলদাররা এখন বাসিয়া নদীকে খাল হিসেবে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। নদীর প্রাণ ফেরাতে দ্রুত সীমানা নির্ধারণ করে দখলদার উচ্ছেদ ও খননকাজের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাঁরা বলছেন, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত নগরোন্নয়ন ও বর্জ্য ফেলার কারণে প্রায় ৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বাসিয়া নদী মৃতপ্রায়। নদীর পানি বিষাক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়ায় জনজীবন বিপন্ন, বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ বাড়ছে এবং মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিশ্বনাথ পৌর শহর, নতুন ও পুরাতন বাজারসহ নদীর দুই তীরজুড়ে জমে আছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। প্রতিদিন রাতের আঁধারে বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও হোটেল-রেস্টুরেন্টের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। পচা বর্জ্যের উৎকট গন্ধে পাশ দিয়ে এখন হেঁটে চলাও দুষ্কর হয়ে পড়েছে।নদীপাড়ের পরিবেশকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সুহেল আহমদ বলেন, ‘বিশ্বনাথের অভ্যন্তরে অন্তত ২৫০টি ছোট-বড় স্থাপনা রয়েছে। এসবের ময়লা এ নদীতে এসে পড়ে। নদীর দুই পাশে মাসুকগঞ্জ বাজার, কামাল বাজার, মুন্সীবাজার, লালাবাজার, বিশ্বনাথ, কালীগঞ্জবাজার, গুদামঘাট, কোনারাইবাজার, রানীগঞ্জ, জামালপুর বাজারের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে।’
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত দুই-তিন দশকে নদীর দুই তীর দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা। কোথাও নদীর ভেতরেই মাটি ভরাট করে বসতঘর ও দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে এক সময় প্রায় ২০০ মিটার প্রশস্ত নদীটি সংকুচিত হয়ে অনেক স্থানে কয়েক ফুটে নেমে এসেছে। বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে আসে না। আর শুকনো মৌসুমে হেঁটে পার হওয়া যায় নদীর একপাড় থেকে অন্যপাড়ে।
উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, নদীর তীরে অবৈধ দখল উচ্ছেদে ২০১৭ সালে ১৮৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হলেও দীর্ঘ আট বছরেও তা কার্যকর হয়নি। দখলদারদের করা রিটের কারণে উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। আইনি জটিলতার সুযোগে দখলদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অপরদিকে, নদী দূষণের প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যে। চিকিৎসকেরা বলছেন, দীর্ঘদিন এমন পরিবেশে বসবাস করলে ফুসফুসের জটিলতা এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
বিশ্বনাথ পুরানবাজারের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, ‘‘দুর্গন্ধ আর বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে তাঁরা ঠিকমতো ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছেন না। এখানকার ব্যবসায়ীরা অসুবিধার মধ্যে আছেন। তাঁরা দ্রুত নদীটিকে খনন করে পুরোনো রূপ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।’’
বিশ্বনাথ মডেল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সোহেল আহমদ বলেন, ‘নদীর এই অবস্থা শুধু পরিবেশের জন্য নয়, মানুষের জীবনযাত্রার জন্য মারাত্মক হুমকিতে ফেলেছে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, সিলেটের সুরমা বাদে বিশ্বনাথ উপজেলার সবচেয়ে বড় নদী ছিল বাসিয়া। দখলদারদের থাবাব নদীটি মৃতপ্রায়। একসময় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এই নদী দিয়ে নৌকায় পণ্য আনা-নেয়া করতেন। বর্ষাকালে নদীর স্রোত স্থানীদের ঘুম ভাঙত। শতবর্ষী নদীটিকে রক্ষায় খননের পাশাপাশি দখলদারদের উচ্ছেদের দাবি জানান তিনি।’
এদিকে, আগামী ২ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মৃতপ্রায় বাসিয়া নদী খনন কাজের উদ্বোধন করবেন বলে জানালেন বাণিজ্য, শিল্প, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকালে সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাওয় ইউনিয়নের মাসুকবাজারে বাসিয়া নদীর উৎস মুখ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান। পরিদর্শনে তাঁর সঙ্গে ছিলেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ।
বাসিয়া নদী খনন প্রসঙ্গে বানিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই খালের পূর্ণ দৈর্ঘ্য ৪০ কিলোমিটার। খনন হবে ২৩ কিলোমিটার। সদর উপজেলার মাসুকগঞ্জ বাজার থেকে শুরু হয়ে ওসমানীনগর উপজেলা হয়ে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পর্যন্ত খনন হবে। এতে এই ৯০ হাজার কৃষক উপকার পাবে। আর শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হওয়ায় প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে বাড়তি ফসল উৎপাদন হবে।’
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে কুলসুম রুবি গতকাল বৃহস্পতিবার এদিনকে বলেন, ‘প্রতিদিন নদীতে প্রচুর ময়লা পড়ছে। এখন এগুলো তুলতে হবে। তার আগে ময়লা ফেলা বন্ধ করতে হবে। নদীর পাশে স্থায়ী ও কিছু অস্থায়ী ডাস্টবিন তৈরি করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাইকোর্টে দখলকারীদের দুটি রিট চলমান থাকায় আপাতত উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। রায়ের পর আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









