মৃত্যুদণ্ডের বিধান পুরোপুরি বাতিল করে আরব বিশ্বে নতুন নজির তৈরি করেছে লেবানন। এর ফলে লেবাননে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে অপরাধীদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও কঠোর শ্রমের শাস্তি দেওয়া হবে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দেশটির সংসদ ঐতিহাসিক এ আইন পাস করেছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি (এনএনএ) জানিয়েছে, ১২৮ সদস্যের সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য আইনটির পক্ষে ভোট দেন। তবে হিজবুল্লাহর সংসদীয় ব্লক এর বিরোধিতা করেছে।
নতুন আইনটি পাসের পর লেবাননকে প্রথম আরব দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুদণ্ড বাতিলকারী দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত দেশটির বিচারমন্ত্রী আদেল নাসার আইনটি পাসকে লেবাননের জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মৃত্যুদণ্ড বাতিলের এই উদ্যোগটি প্রথম সংসদে তোলা হয় ২০২৫ সালের অক্টোবরে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাতজন সংসদ সদস্য এই প্রস্তাবের পক্ষে ছিলেন। আইনপ্রণেতা আবদুর রহমান আল-বিজরি প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন।
সংসদে অনুমোদনের আগে প্রস্তাবটিতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়। সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, আইন কার্যকর হওয়ার আগে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে। আর আইন কার্যকর হওয়ার পর গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে দেওয়া হবে কঠোর শ্রমসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
দীর্ঘদিনের দাবির পর সিদ্ধান্ত
লেবাননে মৃত্যুদণ্ড বাতিলের দাবি নতুন নয়। দেশটির মানবাধিকার সংগঠনগুলো বহু বছর ধরে এ বিষয়ে প্রচার চালিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচও সংসদকে আইনটি পাস করার আহ্বান জানিয়েছিল।
সংগঠনটি জুলাই মাসে বলেছিল, লেবাননের উচিত আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করা। কারণ দেশটিতে ২০০৪ সাল থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ওপর অনানুষ্ঠানিক স্থগিতাদেশ থাকলেও আইনে এখনো এই শাস্তির বিধান বহাল ছিল।
অর্থাৎ, গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে লেবাননে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা না হলেও আদালত কোনো অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সুযোগ রাখত। নতুন আইন সেই সুযোগও বন্ধ করে দিল।
মানবাধিকারের প্রতি সম্মান
লেবাননের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুদণ্ড বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিল। গত জুনে কমিশন আইনটির অগ্রগতিকে স্বাগত জানায় এবং সংসদ সদস্যদের মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি কঠোর শ্রমের শাস্তিও আইন থেকে বাদ দেওয়ার আহ্বান জানায়।
কমিশনের যুক্তি ছিল, অপরাধের শাস্তি অবশ্যই মানুষের মর্যাদার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে এবং অপরাধীকে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, মৃত্যুদণ্ড বাতিলের মাধ্যমে লেবানন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে আরো সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বিচারব্যবস্থার দিকে এগিয়ে গেল।
হিজবুল্লাহর বিরোধিতা
তবে আইনটি সর্বসম্মতভাবে পাস হয়নি। হিজবুল্লাহর সংসদীয় ব্লক এর বিরোধিতা করেছে। সংগঠনটির বিরোধিতা সত্ত্বেও সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য আইনটির পক্ষে ভোট দেন।
লেবাননের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে বিভক্ত। এমন পরিস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি আইনি পরিবর্তন সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হওয়াকে দেশটির বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন আইন কার্যকর হলে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে। এর ফলে কোনো অপরাধীর জীবন রাষ্ট্রীয়ভাবে শেষ করার পরিবর্তে তাকে কারাগারে রেখে শাস্তি ও সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হবে।
লেবাননের এই সিদ্ধান্ত আরব বিশ্বে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে চলমান বিতর্কেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো আশা করছে, দেশটির এই পদক্ষেপ অন্য আরব দেশগুলোকেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান পুনর্বিবেচনায় উৎসাহিত করবে।
দীর্ঘদিনের অনানুষ্ঠানিক স্থগিতাদেশের পর এবার আইনি কাঠামো থেকেই মৃত্যুদণ্ড বাদ দিল লেবানন। ফলে দেশটির বিচারব্যবস্থায় এটি শুধু একটি আইন পরিবর্তন নয়, বরং মানবাধিকার ও শাস্তি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পরিবর্তন।
সূত্র: সাউথ চায়না পোস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









