ভারত থেকে অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় নিখোঁজ হওয়া এক আফগান নাগরিকের মরদেহের পরিচয় মিলেছে। গত ১৩ এপ্রিল ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার পলিয়ানপুর সীমান্তের ইছামতী নদী থেকে উদ্ধার হওয়া ওই ব্যক্তি ইতালির পাসপোর্টধারী ব্যবসায়ী হাশমত মোহাম্মাদি। পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় সীমান্তে দাফনের ১১ দিন পর তার পরিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাশের ছবি দেখে তাকে শনাক্ত করেছে। পরিবারের দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং এর পেছনে আন্তঃদেশীয় মানব পাচারকারী চক্র জড়িত।
গত ১৩ এপ্রিল মহেশপুর থানা পুলিশ ও বিজিবি মহেশপুর সীমান্তের পলিয়ানপুর এলাকার ইছামতী নদী থেকে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার কওে ময়নাতদন্তের জন্য ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে পাঠায়। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেজে কোনো মিল না পাওয়ায় ১৪ এপ্রিল ঝিনাইদহ আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে মরদেহটি স্থানীয় গোরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। সম্প্রতি মরদেহের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আমেরিকা প্রবাসী মোহাম্মদ ইরা নিশ্চিত করেন যে, এটি তার ছোট ভাই হাশমত মোহাম্মাদি। নিহতের ভাই মোহাম্মদ ইরা আমেরিকা থেকে তার পরিচিত বগুড়ার সন্তান আহসানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
আহসান প্রাথমিকভাবে ধারণা করেন, ঘটনাটি যশোরের চৌগাছা সীমান্তে ঘটতে পারে। তিনি চৌগাছা হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সাইদুর রহমান ইমনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ডা. ইমন তাকে স্থানীয় এক গণমাধ্যমকর্মীর মোবাইল নম্বর দেন। পরবর্তীতে আহসানের মাধ্যমে মোহাম্মদ ইরা চৌগাছার সাংবাদিক রহিদুলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সাংবাদিক রহিদুল ও ডা. ইমনের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরেই নিশ্চিত হওয়া যায় যে, মহেশপুর সীমান্তে উদ্ধার হওয়া সেই অজ্ঞাত ব্যক্তিই আসলে নিখোঁজ হাশমত মোহাম্মাদি।
নিহতের ভাই মোহাম্মদ ইরা জানান, হাশমত আফগানিস্তানের নাগরিক হলেও ইতালির পাসপোর্টধারী ছিলেন। সে ইটালির পাসপোর্ট নিয়ে ভারতে যাতায়াত করতেন। সেখান থেকে বিভিন্ন আংটির পাথর ও রত্ন নিয়ে এসে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্রি করতো। গত পাঁচ বছর আগে তার ভারতীয় কয়েকজন পার্টনারের সঙ্গে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে মারামারি হয়। এই ঘটনায় মামলা হলে ভারতীয় পুলিশ অন্যদের সঙ্গে হাশমতকেও গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘ পাঁচ বছর মামলা চলার পর ভারতীয় আদালত হাশমতকে বেকসুর খালাস দেন কিন্তু দেশে ফেরার কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তাই সে জেল থেকে বের হয়ে ইতালি ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে থাকে। এসময় তার সাথে যশোর এলাকার মানব পাচারকারী মাসুম ও ভারতের পাচারকারী পুরাব হেলা (পরিচয় নিশ্চিত নয়) নামে দুইজনের পরিচয় হয়। মাসুম তাকে পরামর্শ দেয় ভারতীয় সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে গেলে সেখান থেকে সে ইটালি চলে যেতে পারবে। মাসুমের পরামর্শে হাশমত গত ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। পরে ১১-১২ এপ্রিলের দিকে সে তার আমেরিকা প্রবাসী ভাই ইরাকে ফোন করে জানান, সামনে একটা নদী (ইছামতি) আছে। এটা পার হলেই তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারবেন এবং নিরাপদ হয়ে যাবেন। এসময় সীমান্তের মানব পাচারকারী কথিত মাসুম ও পুরাব হেলার (০১৭৯০৮৫১৭৮৫/ +৯১৯৩৩০০৮৫৮৫৩) সাথে আমেরিকা প্রবাসী ভাইয়ের কথাও হয়। মোহাম্মদ ইরার ভাষ্যমতে, কিছুক্ষণ পর ভাইয়ের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি এসময় মাসুমের ফোনও বন্ধ পায়।
মোহাম্মদ ইরা আরও জানায়, কয়েকদিন পর মাসুমের সাথে মোহাম্মাদ ইরার একবার কথা হয়। মাসুম তাকে দুইটি ছবি পাঠিয়ে জানায় আপনার ভাই মারা গেছেন। বাংলাদেশে পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেন। এরপর থেকে মাসুমের ফেনটি বন্ধ রয়েছে। তার দাবি, হাশমতের কাছে থাকা অর্থ সম্পদ হাতিয়ে নিতেই দুই মানব পাচারকারী মাসুম ও পুরাব হেলা নদীতে চুবিয়ে হাশমতকে হত্যা করতে পারে। সর্বশেষ ২২ এপ্রিল বাংলাদেশি আহসানের মাধ্যমে নিহত হাশমতের ভাই ইরা চৌগাছার সাংবাদিকদের সহযোগিতায় মহেশপুর থানার এসআই টিপু সুলতানের সঙ্গে কথা বলে মরদেহটি তার ভাইয়ের বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করে। মোহাম্মদ ইরা জানান, তার আরও এক ভাই লন্ডন প্রবাসী। বর্তমানে বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য ভিসাসহ অন্যান্য কাগজপত্র প্রস্তুত করছে।
মহেশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মেহেদী হাসান বলেন, মরদেহটি উদ্ধার করে সুরতহাল প্রস্তুত করার সময়ই আমাদের ধারণা হয়েছিল এটি কোনো বিদেশি নাগরিক হতে পারে। বর্তমানে নিহতের ভাই ও ভাবী আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এই ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগটি সামনে রেখে আমরা গুরুত্বের সাথে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মহেশপুর থানার এসআই টিপু সুলতান জানান, গত ২২ এপ্রিল জনৈক আহসানের মাধ্যমে তিনি মোহাম্মাদ ইরার সাথে কথা বলে লাশটি তার ভাইয়ের বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন। তার আরেক ভাই লন্ডন প্রবাসী। তিনি বাংলাদেশে আসার জন্য ভিসাসহ অন্যান্য কাগজপত্র প্রস্তুত করছেন। অভিযুক্ত মাসুমের মোবাইল নম্বর পেয়েছি তদন্ত শুরু করেছি। তিনি আরও বলেন, সুরতহাল করার সময় মরদেহের গায়ে আঘাতের কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। এই জন্য ঠিক কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে সেটা জানার জন্য ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
এ বিষয়ে মহেশপুর ৫৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল রফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনার দিন পুলিশের পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়েছিল যে নিহতের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তিনি মন্তব্য করেন, এখন পুলিশ তদন্তের মাধ্যমেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও রহস্য উদঘাটন করতে পারবে।
হাশমতের মরদেহ উদ্ধারের মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে গত ১৬ এপ্রিল একই সীমান্তের ইছামতী নদীর কচুরিপানার নিচ থেকে রতিকান্ত জয়ধর (৪৬) নামে আরও এক বাংলাদেশি নাগরিকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ ও বিজিবি। রতিকান্ত গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন। তার পকেটে থাকা বাংলাদেশি পাসপোর্টের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে একই স্থান থেকে দুটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পলিয়ানপুরসহ পার্শ্ববর্তী সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, সীমান্তে চোরাচালান ও মানব পাচারকারী চক্রের তৎপরতা বাড়ায় তারা নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন।
সীমান্তের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে ঝিনাইদহের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আরিফুল ইসলাম মিটুল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, মহেশপুর সীমান্তে আফগানিস্তানের নাগরিক থেকে শুরু করে বাংলাদেশি নাগরিকের মরদেহ উদ্ধার হওয়া প্রমাণ করে যে, এই সীমান্ত দিয়ে আন্তঃদেশীয় মানব পাচারকারী ও চোরাচালান চক্র কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রশাসনের নজরদারি বা টহল থাকার পরেও কীভাবে বারবার এমন প্রাণহানি ঘটছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
তিনি আরও যোগ করেন, পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা আজ সলিল সমাধির শিকার হচ্ছে। প্রশাসনের উচিত শুধুমাত্র মৃতদেহ উদ্ধার বা মামলাতেই সীমাবদ্ধ না থেকে, স্থানীয় দালাল ও আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা। নতুবা এই সীমান্তে লাশের মিছিল আরও দীর্ঘ হবে এবং দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিকভাবে ক্ষুণ্ন হবে।
বিজিবি সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং টহল জোরদার করা হয়েছে দাবি করে মহেশপুর ৫৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল রফিকুল ইসলাম জানান, সীমান্তে পাচারকারী ও চোরাচালানীদের তৎপরতা বন্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছি। তবে পাচারকারীরা অনেক সময় দুর্গম এলাকা ও অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে এসব অপকর্ম করার চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, পাচারকারী চক্রগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিত। স্থানীয় জনসাধারণের সহযোগিতা ছাড়া তাদের পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন। আমরা স্থানীয়দের সচেতন করছি যাতে কেউ এই মরণফাঁদে পা না দেয়। হাশমত মোহাম্মাদি বা রতিকান্ত জয়ধরের মতো মৃত্যু ঠেকাতে বিজিবি ও পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ করছে এবং পাচারকারী চক্রের হোতাদের ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









