প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আগামীকাল সোমবার (২৭ এপ্রিল) প্রথমবারের মতো যশোরে আসছেন তারেক রহমান। তার এই আগমনকে ঘিরে গোটা যশোর এখন উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে। শহর থেকে গ্রাম, মহাসড়ক থেকে পাড়া-মহল্লা, সর্বত্র সাজসজ্জা, ব্যস্ততা আর প্রতীক্ষার আবহ। রাস্তার পাশে উড়ছে দলীয় পতাকা, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে তৈরি হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন তোরণ, চলছে রং-তুলির কাজ। ঐতিহাসিক যশোর রোডের শতবর্ষী গাছগুলোর গোড়ায় লাগানো হচ্ছে সাদা রং। যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের দুই পাশে চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। বহুদিন পর এমন আয়োজন দেখে স্থানীয়রা বলছেন, যশোর যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তারেক রহমানের যশোরে প্রথম সফর হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি হয়েছে বাড়তি আগ্রহ। শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, এই সফরকে ঘিরে জেলার মানুষের রয়েছে দীর্ঘদিনের নানা প্রত্যাশা। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও ক্রীড়া খাতে বড় ঘোষণা আসতে পারে বলে আশা করছেন অনেকে।
সরকারি কর্মসূচি অনুযায়ী, সোমবার সকাল সোয়া ১০টায় প্রধানমন্ত্রী যশোর বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন। সেখান থেকে সড়কপথে শার্শার উলাশীতে যাবেন। সেখানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত উলাশী-যদুনাথপুর খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করবেন। স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘জিয়া খাল’ নামে এই খালটি ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কোদাল চালিয়ে খননকাজ শুরু করেছিলেন। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর তাঁরই ছেলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এসে সেই খালের পুনর্জাগরণ কর্মসূচি উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন, যা ঘিরে মানুষের আবেগ আরও বেড়েছে।
এরপর প্রধানমন্ত্রী উলাশীতে সমাবেশে যোগ দেবেন। বেলা সোয়া ১টায় তিনি যশোর ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। পরে যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করবেন। সার্কিট হাউসে নামাজ ও দুপুরের খাবার শেষে কেন্দ্রীয় ঈদগাহে যশোর জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় অংশ নেবেন।
যশোরবাসীর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশার একটি হলো বেনাপোল-যশোর-ঢাকা রুটে নতুন ও দ্রুতগামী ট্রেন চালু। দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল থেকে রাজধানীর সঙ্গে দ্রুত রেল যোগাযোগ চালু হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
দীর্ঘদিন ধরে যশোর পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার দাবি রয়েছে স্থানীয়দের। জেলার জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক গুরুত্ব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রশাসনিক বিস্তৃতি বিবেচনায় এ দাবিকে যৌক্তিক মনে করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। প্রধানমন্ত্রীর সফরে এ বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে বলে আশা করছেন অনেকে।
এছাড়া বেনাপোল-যশোর-নড়াইল মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত করার দাবিও জোরালো। বন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহন, আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যানজট নিরসনে এই মহাসড়ক সম্প্রসারণকে অত্যন্ত জরুরি মনে করা হচ্ছে।
কৃষিপ্রধান জেলা যশোরে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিও দীর্ঘদিনের। কৃষি গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
যুবসমাজের প্রত্যাশার তালিকায় রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম নির্মাণ। যশোরে ক্রীড়াপ্রতিভার অভাব নেই, কিন্তু আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বড় স্টেডিয়াম না থাকায় জাতীয় পর্যায়ে সুযোগ সীমিত বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে যশোর জেনারেল হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ সুবিধা ও কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন রোগী ও স্বজনরা। বর্তমানে জটিল রোগীদের খুলনা বা ঢাকায় যেতে হয়, যা সময় ও অর্থ দুই দিক থেকেই কষ্টসাধ্য।
যশোর বিমানবন্দর থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর দাবিও এখন জোরালো। বেনাপোল স্থলবন্দর, প্রবাসী জনগোষ্ঠী এবং ব্যবসায়িক গুরুত্ব বিবেচনায় আন্তর্জাতিক রুট চালু হলে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে শহরজুড়ে এখন উৎসবের আবহ। ঈদগাহ মাঠ, বিমানবন্দর, আরবপুর, ধর্মতলা, চাঁচড়া, বাস টার্মিনাল, শংকরপুর, ঝিকরগাছা, নাভারণ, বাগআঁচড়া, উলাশী ও বেনাপোল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে টানানো হয়েছে ব্যানার-ফেস্টুন। কোথাও লেখা ‘স্বাগতম প্রধানমন্ত্রী’, কোথাও ‘জিয়ার স্বপ্ন, তারেকের বাস্তবায়ন’, আবার কোথাও ‘উন্নয়নের নতুন যাত্রায় যশোর’।
প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। জেলা প্রশাসন, পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) সদস্যরা ইতোমধ্যে একাধিকবার অনুষ্ঠানস্থল পরিদর্শন করেছেন।
সফরকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে এলাকা পরিদর্শন করেছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আল ফরহাদ হোসেন আজাদ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব এ কে এম শাহাবুদ্দিন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এবং যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তারা অনুষ্ঠানস্থলের প্রস্তুতি, খাল পুনঃখননের পরিকল্পনা এবং স্থানীয় অবকাঠামোগত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেন।
শার্শা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা মাওলানা আজিজুর রহমানও অনুষ্ঠানস্থল ও খাল এলাকা পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনকালে তিনি স্থানীয় কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, উলাশী-যদুনাথপুর খাল পুনঃখনন এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। খালটি সচল হলে জলাবদ্ধতা দূর হবে, কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং এলাকার অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
যশোর জেলা প্রশাসক আশেকে হাসান, শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে ওয়াহিদ, জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাবেরুল হক সাবু, সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন, উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাসান জহির, সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটনসহ প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতারা দফায় দফায় এলাকা পরিদর্শন করে প্রস্তুতি তদারকি করছেন।
শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে ওয়াহিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হচ্ছে। অনুষ্ঠানস্থলে নিরাপত্তা, যানবাহন চলাচল, জনসমাগম ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচ্ছন্নতাসহ সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাসান জহির বলেন, উলাশী খাল শুধু একটি খাল নয়, এটি এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজে এসে পুনঃখননের উদ্বোধন করায় মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাবেরুল হক সাবু বলেন, উলাশী খালের সঙ্গে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এই খাল পুনঃখননের মাধ্যমে শুধু একটি জলপথ নয়, একটি ইতিহাসও পুনর্জীবিত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝেও দেখা গেছে ব্যাপক উৎসাহ। উলাশী গ্রামের আব্দুল হান্নান বলেন, জিয়াউর রহমান এই খাল খনন করেছিলেন, এখন তাঁর ছেলে আবার সেই খালের কাজ শুরু করতে আসবেন। এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। পুরো এলাকা এখন ঈদের মতো লাগছে।
নাভারণ বাজারের ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম বলেন, অনেকদিন পর যশোরে এমন বড় আয়োজন হচ্ছে। রাস্তা পরিষ্কার হচ্ছে, দোকানপাট সাজানো হচ্ছে, মানুষ খুব আনন্দে আছে।
কৃষক মতিউর রহমান বলেন, খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পানি নামতে পারে না, ফসল নষ্ট হয়। যদি খাল খনন হয় তাহলে কৃষকরা বাঁচবে, চাষাবাদও বাড়বে।
স্থানীয় শিক্ষক সরোয়ার হোসেন বলেন, এই খাল শুধু পানি নিষ্কাশনের পথ নয়, এটি কৃষি ও মৎস্য অর্থনীতির প্রাণ। পুনঃখনন হলে পুরো অঞ্চলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে উলাশী খাল পুনঃখননের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সেচ সুবিধা বাড়বে, বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশন হবে এবং জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানস্থল, সড়কপথ ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে। গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, জনসমাগম বেশি হওয়ায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কম হয় এবং পুরো সফর নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন করা যায়।
জেলা প্রশাসক আশেকে হাসান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর সফলভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানস্থল, নিরাপত্তা, সড়ক যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তিনি বলেন, যশোরবাসীর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সফর। উন্নয়নমূলক কর্মসূচির পাশাপাশি জেলার ভাবমূর্তির সঙ্গেও এই সফর জড়িত। তাই আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন করছি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









