ময়মনসিংহের গৌরীপুরে টানা বর্ষণ এবং মানবসৃষ্ট জলাবদ্ধতায় বোরো চাষিদের সোনালি স্বপ্নে এখন কান্নার ঢেউ। উপজেলার বিভিন্ন বিলে প্রায় ২০০ হেক্টর জমির আধাপাকা বোরো ধান এখন পানির নিচে। একদিকে প্রকৃতি, অন্যদিকে অপরিকল্পিত পুকুর খনন ও পানি নিষ্কাশনের পথে কৃত্রিম বাঁধ এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে চরম বিপর্যয়ে পড়েছেন স্থানীয় শত শত কৃষক।
সরেজমিনে উপজেলার গৌরীপুর ইউনিয়নের কোণাপাড়া, সাহাবাজপুর, ইছুলিয়া, শালীহর এবং মাওহা, মইলাকান্দা, অচিন্তপুর ও সিধলা ইউনিয়নের বিভিন্ন বিল এলাকায় দেখা গেছে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। কেউ হাঁটুসমান আবার কেউ বুকসমান পানিতে নেমে ধান কাটার চেষ্টা করছেন। কোথাও কোথাও নৌকা ব্যবহার করে ডুবন্ত ধান উদ্ধার করা হচ্ছে। শ্রমিকের তীব্র সংকটে অনেক কৃষককে সপরিবারে পানিতে নেমে ধান কাটতে দেখা গেছে, আবার অনেকে সর্বস্ব হারিয়ে ফসলের দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, শুধু অতিবৃষ্টি নয়, এই জলাবদ্ধতার পেছনে বড় কারণ স্থানীয় প্রভাবশালীদের খামখেয়ালিপনা। মাছ ধরার উদ্দেশ্যে বিল ও খালের মুখে অবৈধ বাঁধ দেওয়া এবং ফসলি জমিতে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন করার ফলে পানি নামার স্বাভাবিক পথগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
কোণাপাড়া গ্রামের কৃষক সাজেদা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, শ্রমিক পাইতাছি না, এর মধ্যে আগাম বৃষ্টি সব শেষ করে দিল। আমাগো কষ্টের ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে, আমরা এহন নিঃস্ব। সাহাবাজপুর গ্রামের আব্দুর রউফ দুদু জানান, একদিকে ধান তলিয়ে গেছে, অন্যদিকে এই সুযোগে কম্বাইন হারভেস্টার চালকরা অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন। ফলে দ্বিগুণ ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মোনায়েম খাঁ এই সংকটের জন্য অবৈধ বাঁধ ও অপরিকল্পিত পুকুরকেই দায়ী করে দ্রুত সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে গৌরীপুরে ২০ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে, যার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৮ হাজার ৪৩০ মেট্রিক টন ধান। তবে সাম্প্রতিক দুর্যোগে ইতোমধ্যে ২০০ হেক্টরের বেশি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে গৌরীপুর সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাফরোজা সুলতানা জানান, জলাশয়ে পুকুর নির্মাণে নির্দিষ্ট আইন রয়েছে। কেউ অবৈধভাবে পানি প্রবাহ বন্ধ করে বাঁধ দিলে বা পুকুর নির্মাণ করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফার ইয়াসমিন জলি জানান, দ্রুত পানি নেমে গেলে ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমানো সম্ভব। তিনি বলেন, আমরা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি যাতে অবশিষ্ট ধান দ্রুত কেটে ঘরে তোলা যায়।
ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করা কৃষকরা এখন তাকিয়ে আছেন প্রকৃতির দয়া আর সরকারি প্রণোদনার দিকে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করলে আসন্ন দিনগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









