পিরোজপুর সদর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নে জমিজমা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে গ্রাম পুলিশের (চৌকিদার) উপস্থিতিতে ভাতিজাদের পিটুনিতে মানিক সরদার (৫৫) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর বিষয়টি এক লাখ টাকা নিয়ে মীমাংসার জন্য ভুক্তভোগী পরিবারের উপর চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার ৪ দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় সঠিক বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে নিহতের পরিবার। নিহত মানিক সরদার পূর্ব দুর্গাপুর গ্রামের মৃত ছবেদ আলী সরদারের ছেলে। তিনি পেশায় একজন দিনমজুর ছিলেন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে চলমান একটি মামলাকে কেন্দ্র করে রবিবার (২৬ এপ্রিল) রাত ৯টার দিকে মানিক সরদার ও তার ছেলে মেহেদীকে প্রথমে নিজ বাড়িতে মারধর করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তার ভাইপো রাব্বি সরদার, আজিম সরদার এবং প্রতিবেশী রবিন শেখ, সজিব ও সাইফুল মৃধা তাদের মারপিট করে টেনে-হিঁচড়ে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়।
পরে মানিক সরদারের বড়ভাই মজিবর সরদারের বাড়িতে নিয়ে দ্বিতীয় দফায় বেধড়ক মারপিট করা হয়। এ সময় স্বামী ও ছেলেকে রক্ষা করতে গেলে মানিকের স্ত্রী ফরিদা বেগমকেও মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় ঘটনাস্থলেই মানিক সরদারের মৃত্যু হয়।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠায়। এ ঘটনায় পুলিশ দুইজনকে আটক করলেও পরে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ছাড়াই তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের।
নিহতের স্বজনদের দাবি, এর আগেও জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে তাদের তিনটি গরুকে খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, মরদেহ থানায় নেওয়ার পর একাধিকবার মামলা করার চেষ্টা করলেও পিরোজপুর সদর থানা পুলিশ মামলা নেয়নি। এমনকি লিখিত অভিযোগও গ্রহণ করতে চায়নি। উল্টো আসামিপক্ষের সঙ্গে এক লাখ টাকা নিয়ে বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
নিহতের ছেলে মেহেদী সরদার বলেন, “আমরা ঘরে ঘুমে ছিলাম। হটাৎ রাত ৯ টার দিকে ওরা ৬-৭ জন ঘেরাও দিয়ে ঘরের দরজা ভেঙে আমাকে এবং আমার বাবাকে মারধর করে টেনে-হিচড়ে নিয়ে গিয়ে মজিবর সরদারের ঘরে আটকে রেখে বেধড়ক মারপিট করে। পরে আমার বাবা প্রকৃতির ডাকে বাইরে যায়, বেশকিছু সময় ধরে না আসলে তখন আমি জোর করে বাইরে বের হয়ে গিয়ে দেখি বাবা মাটিতে শুয়ে আছে এবং তার শরীর ও মাথায় আঘাতের চিহ্ন আছে, তখন আমরা বাবা বলে ওরা আমাকে মারছে।”
নিহতের মেয়ে তামান্না আক্তার বন্যা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “রাতে আব্বা ডাক দিলে গিয়ে দেখি অন্ধকারে মাটিতে পড়ে আছে সে ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছেন না। তখন আব্বা বলছিলেন, ডাক্তার দেখাতে নিলে তিনি বাঁচবেন। কিন্তু কেউ তাকে হাসপাতালে নেয়নি। আমার আব্বাকে ওরা পিটাইতে পিটাইতে শেষ করে ফেলছে। এর আগেও আমাদের তিনটি গরু বিষ খাইয়ে মেরে ফেলছিল। আমি এই হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ বিচার চাই।”
নিহতের স্ত্রী ফরিদা বেগম বলেন, “আমাকে এক লাখ টাকা নিয়ে মিমাংসা হইতে বলে কিন্তু আমি আমার স্বামীর হত্যাকারীদের বিচার চাই। আমি খয়রাত করে হলেও মামলা চালাবো, এই সন্ত্রাসীদের বিচার করতেই হবে।”
দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নোমান মৃধা বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও নৃশংস। আমি জানলে এরকমটা হতো না। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”
এ বিষয়ে পিরোজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাসরিন জাহান বলেন, “ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। লাশের সুরতহাল সম্পন্ন করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত থানায় কেউ মামলা করতে আসেনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









