ক্ষণস্থায়ী জীবনে মানুষের থাকে অনেক আশা, অনেক প্রত্যাশা। জীবনটাকে মানুষ চায় সাফল্যের পুষ্প-পল্লবে ভরে দিতে, চায় পূর্ণ কলেবরে বিকশিত করতে। আর লক্ষ্য হচ্ছে মানব জীবনের সোপান। জীবনের সফলতা লাভে এক লক্ষ্য সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আর সেটি প্রমান করলেন একষট্রি বছর বয়স্ক ব্যক্তি অমল পরামানিক। এক কাঁচি তাঁর জীবন বদলে দিল। কাঁচিই তার পরিবারের এক মাত্র আয়ের উৎস। তিনি জীবনের প্রথম থেকে মানুষের চুল, দাঁড়ি ছাটাই করে আসছেন। পেশায় একজন পরামান্য। তাঁর পূর্ব পুরুষরাও এই পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন।
তাঁর বাড়ী সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ী ইউনিয়নের খুটিকাটা গ্রামে। পিতা মৃত নিরাপদ ও মাতা বিমলা রানী পরামান্যের ৩য় সন্তান তিনি। তিনি বলেন জমিদার হরিচরণ রায় বাহাদুরের খাস প্রজা হিসাবে তাদের পূর্ব পুরুষদের এখানে বসবাস করার সুযোগ দেন। তার বিনিময়ে তাদের ও এলাকার মানুষের চুল, দাঁড়ি কামিয়ে (ছাটাই) দিতে হবে। এই কাজের বিপরিতে তাদের পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া হত একটি মাথা চুল কাটা ও একটি দাঁড়ি সেভ করা হলে এক আড়ি ধান । বেশি বেশি চুল কাটা ও দাঁড়ি সেভ করা হলে ৮ পালি ধান দেওয়া হত বছরে। তার বাবা ও সে সহ ভাইয়েরা উপজেলার কাঁচিহারনিয়া, আটুলিয়া, কাঁঠালবাড়ীয়া, খুটিকাটা গ্রামের পরিবার গুলোর এই সেবা প্রদান করতেন বলে জানান। এ ছাড়া সকল হিন্দু ধর্মীয় উৎসবে ফুল তুলে দিয়ে সেবাইত হিসাবে কাজ করতেন।
লেখাপড়া তার প্রাথমিকও শেষ করা সম্ভব হয়নি। ১৮ বছরে বয়সে বিয়ে করেন এবং বিয়ের পর তার স্ত্রীও এই পেশার সাথে যুক্ত হন। অমল পরামান্যের তিন ভাই সকলে একই পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন। তাদের জমি ছিল ৪ ভাই মিলে মাত্র ৪ বিঘা। এই সামান্য আয় দিয়ে তাদের সংসার চালাতে হত। পরবর্তীতে এই আয় দিয়ে সংসার চালানো কষ্টকর হচ্ছে ভেবে ১৯৮৮ সালে কাঁচি,ক্ষুর শান দেওয়ার কাজ শুরু করার চিন্তাভাবনা করেন এবং শুরুও করেন। শান দেওয়া পাথরের চাকাটি কাঁধে বয়ে নিয়ে ফুটপাতে শানের কাজ শুরু করেন। পাথরের তৈরী শান দেওয়া চাকাটি তিনি নিজে তৈরীও করেন। এ সময় তার আয় হত দৈনিক ৫ থেকে ৬ শত টাকা। এর মধ্যে তার পরিবারে চলে আসে দুটি পুত্র সন্তান ও দুটি কন্যা সন্তান। তাদের লেখাপড়া মাধ্যমিক পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। পূর্ব পুরষদের পেশা ধরে রাখতে যেয়ে তাদের লেখাপড়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
অমল পরামান্য ভাবলেন পরিবারে লোকসংখ্য বেড়ে গেছে ব্যয় বেশি আয়ের উৎস বেশি না হলে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে তাই ২০১৮ সালে বিআরডিবি সহ এনজিও থেকে ২ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে শ্যামনগর উপজেলা সদরে স্থায়ী দোকান করেন শ্রীকৃষ্ণ শান ঘর নামে। এখানে কাঁচি শান দেন তিনি বেশি। এছাড়া দোকানে চুল ছাটা কাঁচি, সেভ করার বিভিন্ন প্রকার মেশিন সহ সেলুন সামগ্রী পণ্য বিক্রয়ের জন্য রেখেছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভাল মানের সেলুন সামগ্রী বিক্রয়ের জন্য তিনি অর্ডার করে দোকানে বিক্রয়ের জন্য আনেন। একই সাথে দুই ছেলে নিশিকান্ত ও সাধন পরামান্যকে উপজেলার শংকরকাটি ও হাওয়ালভাঙ্গী সেলুনের দোকান করে দেন। সেখানে তারা দুই ভাই চুল কাটা ও সেভ করার কাজ করেন। তিনটি দোকান থেকে যে আয় হয় তা দিয়ে ঋনের কিস্তী পরিশোধ করেন। তিনি বলেন মাসে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয় হয়। এখন আবার ভাবছেন আরও কিছু ঋণ নিয়ে দোকানটাকে বড় পরিসরে শুরু করা। এই আয় তিনি দু মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন এবং দু কন্যাও একই পেশার সাথে যুক্ত। বর্তমানে তিনি কাঁচি শান দিতে খরচ নেন বড় কাঁচি প্রতি ৪০ টাকা ও ছোট কাঁচি ২৫ টাকা। তার শান ঘরে শুধু শ্যামনগর নয় পাশ্ববর্তী কালিগঞ্জ,আশাশুনি, দেবহাটা সহ অন্যান্য উপজেলার মানুষ আসেন কাঁচি শান দিতে। দৈনিক তার এক থেকে দেড় হাজার টাকা আয় হয় এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে। ছেলেদের ও তার আয় দিয়ে বাড়ীতে ৩ রুম বিশিষ্ট পাকা ঘর নির্মান করেছেন। ৪ বিঘা বিলান জমি কিনেছেন।
অমল পরামান্য বলেন ইচ্ছা থাকলে সবকিছু করা সম্ভব। পূর্ব পুরুষের পেশাকে টিকিয়ে রেখে এখনও চলেছি এবং ভবিষ্যতেও চলব এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









