১ কেজি আলুত (আলুতে) খরচ পড়ছে ১৮ টাকা, আর পাইকাররা দেয় ৫ টাকা। হিমাগারত থুইলে (রাখলে) আবার খরচ বেশি, তাই ঘরোত (ঘরে) থুইছি (রেখেছি)। ৮০ বস্তা আলু একবারে পচি শ্যাষ (শেষ) তাই রাস্তার পাশে ফেলে দিনুং (দিলাম), এ আলু মোক (আমাকে) একবারে নিঃস্ব করি দেইল (দিল)- কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন রংপুরের গংগাচড়া কুড়িয়ার মোড় এলাকার কৃষক মিজানুর।
তিনি আরও বলেন, ‘‘জমি জমাও নাই মাইষের (মানুষের) জমি খন (বর্গা) নিয়া আবাদ করচুং (করেছি)। সে আলু গাড়চুং (লাগানো) লাভের আসায় লাভ তো দূরের কথা খনের (বর্গা) টাকায় তুলবার পানুং (পারলাম) না। রাস্তায় ফেলে দেওয়ার সময় মনে হয়চোল (হয়েছিল) বুকটা ফাটি যায়। এত কষ্টের আবাদ এভাবে নষ্ট হইবে কখনও ভাবং (ভাবি) নাই।
শুধু মিজানুরই নয়, রংপুরের গংগাচড়ার চেংমারী কুড়িয়ার মোর এলাকার প্রায় ২ শ কৃষকদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে আলু।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, শত শত বস্তাভর্তি পচা আলু রাস্তার ধারে ফেলে রাখা হয়েছে। কোথাও কোথাও স্তূপ করা আলু থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দাবি, দাম পড়ে যাওয়ায় বিক্রি করতে না পারায় ও সংরক্ষণের অভাবে এসব আলু পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে ফেলে দিচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর উপজেলায় ৫ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার ২০৭ টন আলু। যা স্থানীয় চাহিদার তুলনায় বেশি। তবে এ বছর আগাম বৃষ্টিতে প্রায় ৬০ হেক্টর জমির আলু বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অতিরিক্ত উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য না থাকায় আলুর দাম কমে গেছে। বর্তমানে পাইকারি বাজারে আলুর দর ৬-৭ টাকা কেজি, তবে মাঠপর্যায়ে কৃষকের কাছ থেকে কেনা হচ্ছে ৪-৫ টাকা কেজিতে। অথচ প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের খরচ দাঁড়িয়েছে ১৮-১৯ টাকা। কৃষকদের দাবি, প্রতি কেজি আলুতে ১০-১৫ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।
উপজেলার একমাত্র হিমাগারের ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার বস্তা। যা ইতোমধ্যে প্রায় পূর্ণ। ফলে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে বাড়িতে আলু সংরক্ষণ করেছেন। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও আর্দ্রতার কারণে এসব আলু দ্রুত পচে যাচ্ছে।
চেংমারী গ্রামের কৃষক চান মিয়া (৫০) জানান, তিনি নিজের জমির পাশাপাশি বর্গা, লিজ নেওয়া জমিসহ প্রায় ৩ একর জমিতে আলু চাষ করেছেন। সার ও কীটনাশক দোকান থেকে বাকিতে নিয়ে আলু চাষ করেন তিনি। ফলন ভালো হলেও বিক্রির সময় পাইকার না পাওয়ায় কিছু আলু হিমাগারে রাখেন এবং প্রায় ২০০ বস্তা বাড়িতে সংরক্ষণ করেন। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও আর্দ্রতায় বাড়ীতে রাখা আলুগুলো দ্রুত পচে যেতে শুরু করে।
গংগাচড়া এমএনটি হিমাগারের সামনে নবনীদাস এলাকার আলু ব্যবসায়ী মানিক মিয়া বলেন, ‘‘মাঠে ৫ টাকা কেজিতে আলু কিনলেও বস্তা, শ্রমিক, পরিবহন, কোল্ড স্টোরেজসহ এক কেজিতে খরচ পড়ে প্রায় ২০ টাকা। অথচ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৭-৮ টাকা দরে। তাহলে ব্যবসা করব কীভাবে? আগের কেনা আলুই এখন গলার কাঁটা হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুবেল হুসেন বলেন, ‘‘যারা শুরুতে আলু তুলেছেন, তারা ক্ষতির মুখে পড়েননি , কিন্তু দেরিতে তোলা আলু বৃষ্টি ও সংরক্ষণ সমস্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আবহাওয়ার অস্থিরতা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এই পরিস্থিতির মূল কারণ।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









