সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

ভাঙা সাঁকোতে থমকে গেছে জনজীবন, দুর্ভোগ

প্রদীপ রায় জিতু

প্রকাশিত: ১১ মে ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম

আপডেট: ১১ মে ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম

ভাঙা সাঁকোতে থমকে গেছে জনজীবন, দুর্ভোগ

সকালের কোমল আলো ছড়িয়ে পড়তেই নদীর পাড়ে জড়ো হয় শিক্ষার্থীরা। কারও কাঁধে ব্যাগ, কারও হাতে বইখাতা। কিন্তু নদীর ওপারে থাকা স্কুলে পৌঁছানোর সাহস যেন আর আগের মতো নেই। যে বাঁশের সাঁকো ধরে প্রতিদিন নিশ্চিন্তে পার হতো তারা, সেটি এখন শুধুই স্মৃতি। নদীর উত্তাল স্রোতে ভেঙে পড়ে পানির নিচে হারিয়ে গেছে কয়েকটি গ্রামের মানুষের একমাত্র চলাচলের পথ। আর সেই সঙ্গে যেন থমকে গেছে পুরো এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের আরাজি নাগরী-সাগরী ও মাহাতাপুর এলাকার মানুষ বছরের পর বছর ধরে একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভর করেই চলাচল করে আসছিলেন। সম্প্রতি টানা বর্ষণ, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং প্রবল স্রোতের আঘাতে সেই সাঁকোটি ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকেই কয়েকটি গ্রামের মানুষ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর মাঝখানে এখনো ছড়িয়ে রয়েছে ভাঙা বাঁশ, কাঠ আর সাঁকোর অবশিষ্টাংশ। পাড়ের মানুষের চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। কেউ নদীর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন, কেউবা ভাঙা পথের সামনে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো ফিরে যাচ্ছেন।

এলাকাবাসীর ভাষায়, “সাঁকোটা ভাঙেনি, আমাদের স্বাভাবিক জীবনটাই ভেঙে গেছে।”

সাঁকোটি ছিল স্থানীয় শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের যাতায়াতের প্রধান ভরসা। আরাজি থেকে মাহাতাপুর হয়ে কাটগর দাখিল মাদ্রাসাসহ আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে এই পথই ব্যবহার করত শতাধিক শিক্ষার্থী। এখন তাদের অনেক দূরের বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করতে হচ্ছে। কেউ আবার সময় বাঁচাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই নদী পার হওয়ার চেষ্টা করছে।

শিক্ষার্থী মাসুদ রানা জানান, আগে অল্প সময়েই স্কুলে পৌঁছে যাওয়া যেত। এখন অনেক দূর ঘুরে যেতে হয়। বৃষ্টি হলে রাস্তা কাদায় ভরে যায়, তখন চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় ভয় নিয়েই নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

অভিভাবকদের উৎকণ্ঠাও এখন চরমে। এক অভিভাবক বলেন, “প্রতিদিন সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। কখন কী দুর্ঘটনা ঘটে সেই ভয় সবসময় কাজ করে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের এভাবে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে দেখে খুব কষ্ট হয়।”

শুধু শিক্ষার্থী নয়, দুর্ভোগের ভার বইতে হচ্ছে কৃষক ও সাধারণ মানুষকেও। স্থানীয় কৃষকরা জানান, ক্ষেতের উৎপাদিত ধান, সবজি কিংবা অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারে নিতে এখন কয়েক কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে সময়ের পাশাপাশি বাড়ছে পরিবহন ব্যয়ও।

কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, “আগে খুব সহজেই বাজারে যাওয়া যেত। এখন ঘুরপথে যেতে গিয়ে দিনের অনেকটা সময় নষ্ট হয়। খরচও বেড়ে গেছে।”

অসুস্থ রোগীদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। জরুরি মুহূর্তে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার মতো সহজ কোনো পথ এখন আর নেই। স্থানীয়রা জানান, রাতের বেলায় রোগী নিয়ে নদীপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকার অভিজ্ঞতা এখন অনেক পরিবারের কাছে আতঙ্কের নাম।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই এখানে একটি স্থায়ী সেতুর দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার বিষয়টি জানানো হলেও মানুষের ভাগ্যে জোটেনি স্থায়ী সমাধান। ফলে বছরের পর বছর ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো দিয়েই চলাচল করতে হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষায়, বর্ষা এলেই আতঙ্ক বেড়ে যেত। কারণ যেকোনো সময় সাঁকোটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল। এবার সেই আশঙ্কাই বাস্তবে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য জানান, সাঁকো ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত অস্থায়ীভাবে নতুন সাঁকো নির্মাণের পাশাপাশি স্থায়ী সেতুর বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

কাটগর দাখিল মাদ্রাসার এক শিক্ষক বলেন, “সাঁকো ভেঙে যাওয়ার পর থেকে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে আসতে পারছে না। বিশেষ করে ছোট শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে লেখাপড়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।”

তিনি আরও বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষা। কারণ দুর্ভোগের কারণে অনেক শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে বিদ্যালয়মুখী আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

বীরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবীর জানান, ঘটনাটি প্রশাসনের নজরে এসেছে। খুব দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সেখানে স্থায়ী সেতু নির্মাণের সম্ভাবনাও যাচাই করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমা খাতুন বলেন, “এলাকাবাসীর দুর্ভোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হবে।”

তবে আশ্বাসের চেয়ে এখন বাস্তব সমাধানই বেশি প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, দ্রুত একটি নিরাপদ সেতু নির্মাণ করা না হলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে। কারণ একটি সেতু শুধু নদীর দুই পাড়কে সংযুক্ত করে না এটি একটি এলাকার শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, অর্থনীতি এবং মানুষের স্বপ্নের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে।

অই

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.