ঝিনাইদহে সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারির সংকটের সাথে ওষুধ ও শয্যার প্রকট অভাবে স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত সাধারণ মানুষ প্রতিদিন নানামুখী ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবার বেহাল দশার পাশাপাশি মানহীন, অননুমোদিত ও অবৈধভাবে পরিচালিত প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অসাধু তৎপরতায় চিকিৎসা গ্রহীতারাও জিম্মি হয়ে পড়েছে। সারা দেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগের মাঝে এ জেলায় পরিস্থিতি এখনও স্থিতিশীল ও নিয়ন্ত্রণ দাবি করা হলেও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে। ঝিনাইদহের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে চলমান তীব্র ওষুধ সংকটে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ ব্যাহতের ফলে গণস্বাস্থ্য সেবাসমূহ থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছে শহরের নিন্মআয়ের শ্রমজীবীমানুষসহ গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র ও অসহায় মানুষগুলো।
গণস্বাস্থ্যসেবা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আবু তোয়াব অপু বলেন, 'সরকারি হাসপাতালে এখন আর মানসম্মত চিকিৎসাসেবার কোন পরিবেশ নেই। সাধারণ রোগী, বয়স্ক ও নারীদের জন্য বিশেষ কোন সেবাপ্রদানের ব্যবস্থা নেই অথচ রাজনৈতিক বিবেচনা ও ভিআইপি কালচার প্রবণতায় হাসপাতালে আসা সাধারণ মানুষের নানারকম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। হাম উপসর্গে ঝিনাইদহে শিশু মৃত্যু ঘটলেও প্রশাসনের পক্ষে ঘোষিত 'গ্রীণ জোন' সন্তুষ্টিতে থাকলেও ইতোমধ্যে আমাদের জেলায় হাম ও নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ও শিশুমৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারি হিসাবের বাইরে বেসরকারিভাবেও সঠিক কোন সার্ভে না থাকায় শিশুরোগে আক্রান্তের প্রকৃত সংবাদ ধামাচাপা হয়ে যায়। সারাদেশে হাম মহামারী আকার ধারণের ফলে ৪ শতাধিক শিশুমৃত্যু ঘটেছে। শিশুমৃত্যু থামাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি হাসপাতালকে পর্যাপ্ত পরিমাণে আইসিউ সুবিধাসহ আধুনিকায়ন করতে হবে। রোগসনাক্ত হলে হাসপাতালেই বিনামূল্যে টেস্ট ও ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।'
ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনেরা জানান, 'তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ পাচ্ছেনা। পর্যাপ্ত চিকিৎসকের অভাবে তাদের ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়েও চিকিৎসকের কাছে অনেকসময় পোঁছানো অসম্ভব হয়ে ওঠে। এমনকি চিকিৎসকের কছে যাবার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট কাটতেও কয়েক ঘন্টা সময় লাগার ফলে বিলম্বে পৌঁছাতে হয়। বঞ্চিত হন দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা।' হাসপাতালের সার্জারি, গাইনি ও মেডিসিন ওয়ার্ডের বেশ কিছু রোগীর সাথে কথা বলে জানা যায়, 'তারা বেডের অভাবে ওয়ার্ডের মেঝে বা বারান্দায় বিছানা পেতেছেন। শিশু ওয়ার্ডেরও অবস্থা একই। ৪৭ জনের জন্য বরাদ্দকৃত শিশু বিভাগে গড়ে প্রায় দু'শত রোগী ভর্তি থাকে। ফলে তাদের পর্যাপ্ত সময় দিয়ে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা।'
ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আনোরুল ইসলামের সাথে কথা বললে তিনি জানালেন, 'প্রতিদিন তার ওয়ার্ডে প্রায় দু'শো রোগী ভর্তি থাকেন। অথচ, শয্যার সংখ্যা আগের মতই ৪৭টিই। ফলে অতিরিক্ত প্রায় তিনগুণ রোগীকে মেঝে বা বারান্দায় বিছানা পেতে থাকতে হয়। অনুুমাদিত ৪৭ জনের মতো সবাইকে একইভাবে ওষুধ ও চিকিৎসাদি দিতে গিয়ে তারা সমস্যায় পড়েন। প্রতিটি শিফটে মাত্র তিনজন সেবিকা, এত রোগির দেখভাল করতে গিয়ে মাঝে-মধ্যে রোগী ও তাদের স্বজনদের কাছে হেনস্তাও হয়ে থাকেন যেটি অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মনে করেন শিশু বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আনোরুল ইসলাম। তাঁর মতে, জেলাপর্যায়ের একমাত্র হাসপাতালের বহির্বিভাগে সাড়ে ৩শ’ থেকে চারশ’ শিশু রোগী আসে চিকিৎসা নিতে। পর্যাপ্ত চিকিৎসকের অভাবে তাদের প্রয়োজনীয় সেবাদানও ব্যাহত হয়।'
ঝিনাইদহের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে তীব্র ওষুধ সংকট দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ না থাকায় সেবা নিতে এসে দিনের পর দিন ঘুরেও খালি হাতে ফিরছেন রোগীরা। বাধ্য হয়ে অনেকেই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে বেসরকারি ক্লিনিক বা ফার্মেসি থেকে ওষুধ ক্রয় করছেন।
জানা যায়, স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ঝিনাইদহের ৬ উপজেলার ৬৭ টি ইউনিয়নের ১৮৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করে সরকার। এক বছর আগেও এসব ক্লিনিক থেকে জ্বর, সর্দি, কাশি, মাথাব্যথাসহ সাধারণ রোগের জন্য বিনামূল্যে ২৭ প্রকার ওষুধ সরবরাহ করা হতো। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ ক্লিনিকে মাত্র ২ থেকে ৩ প্রকার ওষুধ রয়েছে, আবার কোথাও একেবারেই ওষুধ বিতরণ বন্ধ রয়েছে। ওষুধ নিতে এসে দিনের পর দিন ফিরে যেতে হচ্ছে সেবাপ্রত্যাশীদের। সদরের কালুহাটি কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ কেয়ার প্রভাইডার মাজেদুল হক বলেন, 'আমাদের কাছে রোগী আসে, কিন্তু দেওয়ার মতো ওষুধ নেই। এতে রোগীরাও ক্ষুব্ধ হচ্ছেন, আমরাও বিব্রত হচ্ছি। এখন রোগী আসলে শুধু স্বাস্থ্য শিক্ষা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমাদের তো কিছু করার নেই।'
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, হামের বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা বর্তমানে ‘গ্রিন জোন’ বা নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। ঝিনাইদহ সিভিল সার্জনের দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত ৪২ দিনে জেলায় হামের লক্ষণ নিয়ে মোট ১১৫ জন রোগী হাসপাতালে এসেছে। শারীরিক অবস্থার বিবেচনায় ১০৫ জন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। উন্নত চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে ৮৩ জন শিশু। হাম উপসর্গসহ বিভিন্ন রোগাক্রান্ত অসংখ্য শিশু বর্তমানেও ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে এবং তারা সবাই আশঙ্কামুক্ত হলেও শিশুদের মা-বাবা ও আত্মীয়দের মাঝে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা রয়েছে। ঝিনাইদহ সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের এমওসিএস ডা. ফারহানা তাসনীম জানান, 'ঝিনাইদহ জেলা এখন পর্যন্ত গ্রিন জোনে রয়েছে। আমরা প্রতিটি কেস নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। লক্ষণ নিয়ে আসা রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।'
ঝিনইদহ জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান সোহেল আলাপকালে জানিয়েছেন, 'জেলা সদর ও বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ের সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক সংকট এতই প্রকট যে, মানুষের ক্রমবর্ধমাণ চাহিদার সাথে তারা পেরে উঠছেন না। তবুও চিকিৎসক ও চিকিৎসাসেবার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রচেষ্টায় তার সর্বোচ্চ সেবাদানের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতেও সরকারিভাবে ওষুধ সরবরাহ একদম কমে গেছে। কবে নাগাদ ঠিক হবে তাও সিওর বলা যাচ্ছে না। আশা করছি দ্রুতই ওষুধ সরবরাহ ঠিক হলে এই সংকট কেটে যাবে।
সারাদেশে হাম-রুবেলায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার রেকর্ড গড়লেও জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ও সকলের সহযেগিতায় তারা সেটি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছেন। গত তিন মাসে জেলায় ২জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে উল্লেখ করে সিভিল সার্জন বলেন, গত ২০ এপ্রিল শুরু হওয়া হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ১ লাখ ৯১ হাজার ২'শ ২৬ জন শিশুকে টিকা দেয়ার কথা থাকলেও তার শতকরা ১'শ ১ ভাগ শিশুকে টিকার আওতায় এনেছেন। ১০ মে থেকে বাড়িয়ে হাম-রুবেলার টিকা কার্যক্রম ২০ মে পর্যন্ত করা হয়েছে যাতে নির্ধারিত বয়স বা কাছাকাছি বয়সের কোন শিশুই বাদ না পড়ে। অনেক অভিভাবকই তাদের শিশুকে সময়মত টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে না যাওয়ায় সংক্রমণ বেড়েছে বলে মন্তব্য করে সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান সোহেল আরো জানান, প্রতিটি বাবা-মা বা অভিভাবকের উচিত নিজ উদ্যোগে টিকাকেন্দ্রে গিয়ে শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা।'
সূত্র জানায়, ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের ৮৭ চিকিৎসকের ২০টিই শুন্য। সেখানে ৮জন ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার বা এমওর মধ্যে ১ জন কর্মরত। নেই কোন প্যাথলজিস্ট ও রেডিওলজিস্ট। ৪ জন এনেস্থেটিস্ট এর ৩ জনই নেই। প্যাথলজিস্ট, রোডিওলজিস্ট, ডেন্টাল সার্জন, সহকারী রেজিস্টার ও মেডিকেল অফিসার হোমিও এবং ইউনানি পদও ফাঁকা পড়ে আছে।
জেলা সদর সংযুক্ত সংসদীয় এলাকাভুক্ত হরিণাকুণ্ডু উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নানাবিধ সমস্যার করা চিকিৎসা সেবার কোন পরিবেশ নেই। এ উপজেলা হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল অফিসার, আইএমও, এমারজেন্সি মেডিকেল অফিসারের পদ খালি পড়ে আছে। ১৭ সহকারী সার্জনের ৮টি পড়ে আছে শুন্য।
শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসারের ৩টি পদই শূণ্য। ১৩ জন সহকারি সার্জনের ১০টি পদ শুন্য, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রতিদিন বহির্বিভাগে সাড়ে ৩শ থেকে ৪শ রোগী আসে। সেইসাথে ৫০ শয্যার স্থলে ১শ'র বেশি রোগী ভর্তি থাকলেও তীব্র চিকিৎসক সংকট, বিছানার অভাব এবং কতিপয় চিকিৎসকের মধ্যে বাইরের ক্লিনিক বা বেসরকারি হাসপাতাল নামক স্থানে রোগী ভাগিয়ে দেয়ার মত অভিযোগও রয়েছে। তাছাড়া, হাসপাতালে ভর্তি বা বহির্বিভাগে আসা রোগীদের যেকোন ছল-ছুঁতোয় বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় টেস্টের জন্য পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে। কতিপয় চিকিৎসক সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ইউনানি বা আয়ূর্বেদ ওষুধের জন্যও ব্যবস্থাপত্র লিখে দেন। আর সহজ-সরল বা দরিদ্র রোগীরা সেই কথিত ওষুধ তিন-চারগুণ বেশি টাকা ব্যয়ে করে ক্রয়ে বাধ্য থাকেন।
চিকিৎসা সেবা নামেমাত্র, কালীগঞ্জ উপজেলা হাসপাতাল ভালো সেবা নেই বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী সেবা গ্রহণকারীরা। সেখানে ১৫ জন সহকারী সার্জনের মধ্যে আছেন ৯ জন। এখানে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ও আরএমওর পদ দুটিই শুন্য। ৫ জন করে মেডিকেল অফিসার ও ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসারের ৩টি করেই শূন্য। ১৬ সহকারী সার্জনের ৭টি পড়ে আছে দীর্ঘদিন। প্যাথলজিস্ট, এনেস্থেটিস্ট, ডেন্টাল সার্জন ও সহকারী ডেন্টাল সার্জনের পদও শুন্য।
জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির দিনকাল ভালো যাচ্ছে না এখানেও নেই আবাসিক মেডিকেল অফিসার। ৬ জন করে মেডিকেল অফিসার ও ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসারের মধ্যে আছেন ২ জন করে। ৯ জন সহকারী সার্জনের বিপরীতে আছেন ৫ জন, নেই প্যাথলজিস্ট ও রেডিওলজিস্ট।
ঝিনাইদহের সীমান্তবর্তী মহেশপুরেও স্বাস্থ্যসেবার হাল একবোরেই বেহাল। এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৪ জন মেডিকেল অফিসারের ৬ জন জনই নেই। ১০ সহকারী সার্জনের সবগুলো পদই ফাঁকা। না আছে প্যাথলজিস্ট, না আছে এনেস্থেটিস্ট ও ডেন্টাল সার্জন। হোমিও মেডিকেল অফিসারের পদটাও ফাঁকা পড়ে আছে বহুদিন।
ঝিনাইদহে অবৈধ ও মানহীন প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ডেন্টাল কেয়ারগুলো নিয়ম বহির্ভূত ও অবাধে চিকিৎসার নামে মানুষের পকেট কেটে পথে বসিয়ে ছাড়ে। তথ্য অনুযায়ী, এ জেলায় ২২৭টি নিবন্ধিত প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে মাত্র কয়েকটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লাইসেন্স নবায়ন করেছে। অনিবন্ধিত অবস্থায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে শতাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্রাইভেট হাসপাতাল। হাতে গোনা কয়েকটি ব্যতীত বেশিরভাগ হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। অথচ, এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম। হচ্ছে ঝুকিপূর্ণ অস্ত্রোপচার। অস্ত্রোপচারের সময় এ্যানেস্তেসিয়াগত ত্রুটির কারণে মৃত্যুর মুখে ঝুকে পড়ছে অনেকেই। মানহীন এসব ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষার ভুল রিপোর্টের অভিযোগ তো আছেই। রোগীর মৃত্যুর ঘটনার পরে এসব প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য বিভাগ বন্ধ করে দিলেও অদৃশ্য শক্তির বলে পুনরায় চলছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে বছরের পর বছর প্রতিষ্ঠানের ত্রুটিগুলো দেখেও না দেখার ভান করে রয়েছেন কর্তৃপক্ষ। সকল শর্ত মেনে লাইসেন্স পাওয়া দুরুহ বলে মাসিকভাবে টাকা দিয়ে কেউ কেউ প্রতিষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে তারা লোক ঠকানো এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
ঝিনাইদহ জেলাজুড়ে ১৮ লাখের বেশি মানুষের চিকিৎসার জন্য নির্মিত সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও বেডের অভাবে রোগীরা সুষ্ঠুু চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আর এক্ষেত্রে চিকিৎসা সেবার জন্য তারা ছুটছেন বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে। আর সেখানেই গলাকাটা হচ্ছে নিরীহ মানুষের। হাসপাতালের একশ্রেণির চিকিৎসকও এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে রোগীদেরকে বেসরকারি পর্যায়ের কথিত ক্লিনিক ও হাসপাতালে
ভাগিয়ে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে ভুক্তভোগী রোগী ও তাদের স্বজনদের। চিকিৎসা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সহায়ক রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মানুষ ছুঁটে যায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থা আজ ব্যবসায় রুপান্তরিত হয়েছে। কতিপয় স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে। ঝিনাইদহে ব্যাঙের ছাতার মত যত্রতত্র গজিয়ে উঠেছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্রাইভেট হাসপাতাল। যেগুলোর অধিকাংশেরই নেই স্বাস্থ্য বিভাগের অনুমোদন। নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। বেশিরভাগ প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসার পরিবেশ নেই। ল্যাবে নেই নমুনা সংরক্ষণের যথাযথ পরিবেশ। বাসাবাড়ি বা গোডাউনে কেউ কেউ শুরু করেছেন এসব প্রতিষ্ঠান। স্বাস্থ্য বিভাগের অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই অদৃশ্য এক শক্তির বলে চলেছে এসমস্ত হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো।
ঝিনাইদহের বেশ কয়েকটি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালের স্থানীয় বেশকিছু চিকিৎসক কোন না কোন বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতালের সাথে সংশ্লিষ্ট। তাদের ভাষায়, 'ডাক্তাররা' সরকারি হাসপাতালের সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে ভালো ও উন্নতমানের চিকিৎসা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রোগীদের সেখানে যেতে প্ররোচিত করেন। এসব চিকিৎসকের অনেকেই আবার রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রভাব খাটানোর কারণে রোগীরাও অনেকক্ষেত্রেই অসহায় বোধ করেন। ফলে প্রতিবাদ করার সাহস কেউ দেখাননা। বাইরে থেকে চাকরি করতে আসা চিকিৎসকরাও এসব ক্ষেত্রে মুখ খোলেননা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









