দশমিনা উপজেলার ৬ নম্বর বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নে ব্যতিক্রমধর্মী আঙুর চাষ করে আলোচনায় এসেছেন উদ্যোক্তা মোঃ আকরাম মৃধা। কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে তিনি ১৫ শতাংশ জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে গড়ে তুলেছেন রাশিয়ান ভ্যারাইটি “বাইকুনুর” আঙুরের বাগান। বর্তমানে তার বাগানে ২০০টিরও বেশি আঙুর গাছ রয়েছে। সফলভাবে উৎপাদন অব্যাহত থাকলে বছরে ১০ লাখ টাকার বেশি আঙুর বিক্রির আশা করছেন তিনি।
স্থানীয়ভাবে এই প্রথম এমন উন্নত জাতের আঙুর চাষ হওয়ায় প্রতিদিনই বাগানটি দেখতে ভিড় করছেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ। কৃষিপ্রেমী ও আগ্রহী দর্শনার্থীদের কাছেও বাগানটি হয়ে উঠেছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
উদ্যোক্তা আকরাম মৃধা জানান, আমি ইউটিউবে বিভিন্ন দেশের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও আঙুর চাষের ভিডিও দেখে তিনি উদ্বুদ্ধ হন। পরে যশোর থেকে প্রথম একটি আঙুরের চারা এনে নিজ বাড়িতে রোপণ করেন। প্রায় এক বছরের মধ্যেই গাছে ফল আসতে শুরু করলে তার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।
এরপর তিনি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার একটি আঙুর বাগান পরিদর্শন করেন। সেখানে মেহেদী নামে এক উদ্যোক্তার কাছ থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরে গত বর্ষা মৌসুমে “বাইকুনুর” জাতের ৭০টি চারা সংগ্রহ করে পরীক্ষামূলকভাবে রোপণ করেন
তিনি বলেন,কিছু গাছ পরিচর্যার অভাবে মারা গেলেও অধিকাংশ গাছ টিকে গেছে। এক বছরের মধ্যেই গাছে ফলন এসেছে। প্রতিটি গাছ চার ফুট দূরত্ব রেখে লাগানো হয়েছে। আশা করছি প্রতিটি গাছ থেকে ১৫ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত আঙুর পাওয়া যাবে।
তিনি আরও জানান, রাশিয়ান ভ্যারাইটি “বাইকুনুর” আঙুর একটি উচ্চফলনশীল, মিষ্টি স্বাদের এবং লম্বাটে লাল-বেগুনি রঙের হাইব্রিড জাত। বাজারে এ জাতের আঙুরের চাহিদাও বেশ ভালো। সঠিক পরিচর্যা ও অনুকূল পরিবেশ পেলে এ জাতের আঙুরে অধিক ফলন সম্ভব।
আকরাম মৃধা বলেন, এই জাতের আঙুর বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকাতেই চাষ করা সম্ভব। তবে জমি একটু উঁচু হতে হবে, যাতে পানি জমে না থাকে। এটি বারোমাসি জাত হওয়ায় সারা বছরই ফলন পাওয়া যায়।
সম্প্রতি তিনি নওগাঁ জেলার একটি ২৬ বিঘা আঙুর বাগানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। সেখানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মোট ৩৫ জন উদ্যোক্তা অংশ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে তাকে একটি সনদপত্রও দেওয়া হয়।
তিনি বলেন,যারা প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তারা ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন। আমার জানামতে, পটুয়াখালীতে আমিই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে এই জাতের আঙুর চাষ শুরু করেছি। সফল হলে আরও বড় পরিসরে আঙুরের বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাগানে আগত দর্শনার্থীদের আন্তরিকভাবে আপ্যায়নও করেন তিনি। গাছে ফল থাকা অবস্থায় আগতদের আঙুর খেতে দিয়েছেন বলেও জানান। বর্তমানে নতুন করে গাছে ফুল এসেছে এবং সামনে আবারও ভালো ফলনের আশা করছেন তিনি।

এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে দশমিনা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাফর আহমেদের সহযোগিতার কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন আকরাম মৃধা। তিনি বলেন,জাফর আহমেদ স্যার সবসময় আমাকে পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি নিজে বাগান পরিদর্শন করেছেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেছেন। কৃষির প্রতি তার আন্তরিকতা সত্যিই প্রশংসনীয়।
তবে আঙুর চাষ আরও সম্প্রসারণে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই উদ্যোক্তা। তিনি সরকারের কাছে একটি পলি নেট স্থাপনের দাবি জানান।
আকরাম মৃধা বলেন,যেখান থেকে আমি চারা সংগ্রহ করেছি, সেখানে সরকারিভাবে পলি নেটের ব্যবস্থা রয়েছে। আমাকেও যদি এমন সহায়তা দেওয়া হয়, তাহলে বছরে দুইবার আঙুর উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে দেশের মানুষকে সারা বছর দেশীয়ভাবে উৎপাদিত উন্নত মানের আঙুর দিতে পারব।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, আকরাম মৃধার এই উদ্যোগ সফল হলে দক্ষিণাঞ্চলে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে তরুণ ও নতুন উদ্যোক্তাদের মাঝেও আধুনিক কৃষির প্রতি আগ্রহ বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাফর আহমেদ বলেন, উদ্যোক্তা মো. কাওসার আলম আকরাম প্রথমবারের মতো আঙুর চাষ করেই সফলতার মুখ দেখেছেন। দশমিনার মাটি আঙুর চাষের জন্য বেশ উপযোগী হওয়ায় ভালো ফলন ও উন্নত স্বাদ পাওয়া গেছে। বিষমুক্ত ও দেশীয়ভাবে উৎপাদিত এ আঙুর বাজারেও ভালো চাহিদা তৈরি করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও বলেন, কৃষি বিভাগ নিয়মিতভাবে বাগানের খোঁজখবর রাখছে এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে কেউ আঙুর চাষে আগ্রহী হলে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। কৃষিতে বহুমুখীকরণ ও নতুন সম্ভাবনা তৈরিতে আঙুর চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









