বরেন্দ্র অঞ্চলে দিন দিন কমে যাচ্ছে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর। চাষাবাদ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নানা কাজে অতিরিক্ত ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহারের কারণে গ্রীষ্ম মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলের অনেক এলাকায় দেখা দেয় তীব্র পানিসংকট। অনেক স্থানে গভীর নলকূপ ছাড়া পানি পাওয়া যায় না। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে।
এই সংকট মোকাবিলায় এবং নিরাপদ সুপেয় পানির স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে রাজশাহীতে প্রবাহিত পদ্মা নদীর পানি শোধন করে সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে রাজশাহী ওয়াসা। প্রায় ৪ হাজার ৬২ কোটি ২২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন হচ্ছে ‘ভূ-উপরিস্থিত পানি শোধানাগার প্রকল্প’। প্রকল্পের আওতায় রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সারেংপুর এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক পানি শোধনাগার (ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট)। ওয়াসা সূত্র জানায়, প্রকল্পটির প্রায় ৪৬ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। চীনের হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড- এর সহযোগিতায় রাজশাহী পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা) এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
এর আগে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় পদ্মা নদীসংলগ্ন চারঘাট উপজেলার ইউসুফপুর, পবা উপজেলার হরিপুর এবং গোদাগাড়ীর সারেংপুর এলাকায় সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। পরে গোদাগাড়ীর সারেংপুর এলাকাকে উপযুক্ত হিসেবে নির্বাচন করা হয়। কারণ, সেখানে পদ্মা ও মহানন্দা নদীর মোহনায় সারা বছর প্রায় ৩০ ফুট গভীর পানি থাকে। স্থান নির্বাচন করার আগে ইনষ্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) ৩০ বছরের পানির গভীরতার তথ্য বিশ্লেষণ করে। এরপরই সেখানে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় ওয়াসা।
প্রকল্পের আওতায় পদ্মা নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে তা শোধনের মাধ্যমে পাইপলাইনে পবা উপজেলার হরিপুরে স্থাপিত বুস্টার পাম্প স্টেশনে নেওয়া হবে। সেখান থেকে নগরবাসীর কাছে সরবরাহ করা হবে বিশুদ্ধ পানি। একই সঙ্গে কাটাখালী, নওহাটা ও গোদাগাড়ীর ৩০টি ওয়ার্ডের বাসিন্দারাও এই প্রকল্পের মাধ্যমে নিরাপদ সুপেয় পানির সুবিধা পাবেন। এতে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পানি শোধনাগার ও বুস্টার পাম্প স্টেশনের নির্মাণকাজ পুরোদমে চলছে। এছাড়া কাশিয়াডাঙা থেকে রাজশাহী মহানগরীর মহাসড়ক পর্যন্ত ট্রান্সমিশন পাইপলাইন স্থাপনের কাজও এগিয়ে চলছে। প্রকল্পের কাজের জায়গায় দিন এবং রাতে একটানা কাজ চলমান রয়েছে। পানির পাইপ স্থাপনের লক্ষে সড়কের পাশে স্কেভেটার মেশিন দিয়ে মাটি গর্ত করা হচ্ছে। এদিকে রাজশাহী মহানগরীরর বিভিন্ন স্থানে সড়কেও চলমান রয়েছে পানির পাইপের সংযোগ স্থাপনের কাজ।
ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি ২০১৮ সালের জুন মাসে অনুমোদন পায়। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে শুরু হয় নির্মাণকাজ। আগামী ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
পানির সংকট দূর হবে জানিয়ে স্বস্তি জানিয়েছে রাজশাহী নগরবাসী। নগরীরর উপশহর এলাকার বাসিন্দা মারুফ আহমেদ বলেন,“রাজশাহীতে পানির সমস্য অনেক আগের। গ্রীষ্মের আগে থেকেই পানির সমস্যা শুরু হয়। ওয়াসা যদি এই কাজ সফলভাবে করতে পারে তাহলে তো আমাদের আর পানির কোন সমস্যাই থাকবে না।”
ভদ্রা এলাকার নয়ন আলী বলেন,“ওয়াসা যেহেতু পদ্মা নদীর পানি পরিশোধিত করবে, এতে ভূ-গর্ভস্থ পানির উপরে চাপ কমবে। আমাদের রাজশাহীতে পানির সমস্যা খুবই প্রকট। গরমের সময়ে টিউবওয়েলে পানি উঠেনা। তখন কিন্ত দরিদ্র মানুষদের কষ্ট করতে হয়। তাই আমি মনে করি এটা একটা ভালো উদ্যোগ। দ্রুত কাজ শেষ হোক এখন এটাই দাবি।”
প্রকল্প পরিচালক ও রাজশাহী ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী পারভেজ মামুদ বলেন, “প্রকল্পের কাজ শেষ হলে নগরবাসী প্রতিদিন ২০ কোটি লিটার আয়রন ও ব্যাকটেরিয়ামুক্ত বিশুদ্ধ পানি পাবে। বর্তমানে রাজশাহীতে প্রতিদিন প্রায় ১৩ কোটি লিটার পানির চাহিদা রয়েছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে শতভাগ পানির চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে।” তিনি আরও বলেন, “এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়–এর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক প্রকৌশলী এস এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “ভবিষ্যতে পানি সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। অনাবৃষ্টি ও তাপপ্রবাহের কারণে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। পদ্মার পানি পরিশোধন করে ব্যবহার করা গেলে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে। তাই প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









