বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে প্রবৃদ্ধির সাফল্যের গল্প শোনালেও সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ উদ্বেগজনক বাস্তবতা হিসেবে সামনে এসেছে। একসময় সরকারের রাজস্ব উদ্বৃত্ত থেকে উন্নয়ন ব্যয়ের একটি অংশ নির্বাহ করা সম্ভব হলেও এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটাতেও ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এটি শুধু আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার ইঙ্গিত নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তাও।
২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে পরিচালন ব্যয়ে রাজস্ব ঘাটতির যে প্রবণতা শুরু হয়েছে, তা পরবর্তী বছরগুলোতে আরও প্রকট হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রধান মাধ্যম এডিপির পুরো ব্যয়ই ঋণের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হয়েছে। এর অর্থ হলো, সরকার নিজের আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করছে এবং সেই ব্যবধান পূরণে ধারাবাহিকভাবে ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি কারণ স্পষ্ট। গত এক দশকে বৃহৎ অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। একই সময়ে বাজেটের আকার দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা সেই হারে বাড়েনি। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও ৭ শতাংশের নিচে, যা বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায়ও কম। ফলে আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে এবং ঋণই হয়ে উঠেছে প্রধান ভরসা।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের চাপও দ্রুত বাড়ছে। দেশি ও বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে। একদিকে ঋণ পরিশোধ, অন্যদিকে নতুন ঋণ গ্রহণ—এই চক্র দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
সরকার সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক ঋণের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করছে। যদিও এতে বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কিছুটা কমে, কিন্তু সুদের ব্যয় বেড়ে যায়। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সীমিত করে দিতে পারে। এর ফলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
নতুন সরকারের জন্য তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ঋণ ব্যবস্থাপনাকে টেকসই করা। এর জন্য প্রথম ও প্রধান কাজ হলো রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা। করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অধিক সতর্কতা এবং ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। যেসব প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয় বা জনস্বার্থে সীমিত প্রভাব ফেলে, সেগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক ঋণ গ্রহণে সতর্ক নীতি অনুসরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উচ্চ সুদ ও কঠোর শর্তযুক্ত বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশ এখনো ঋণ সংকটের অপ্রতিরোধ্য পর্যায়ে পৌঁছেনি। তবে বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক সংস্কার, রাজস্ব বৃদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ এবং দায়িত্বশীল ঋণ ব্যবস্থাপনা। অন্যথায় উন্নয়নের অর্জনগুলো ক্রমেই ঋণের ভারে চাপা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









