বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা জাতির জন্য সংকটের এক কৃষ্ণপক্ষ, যা এক বিশাল ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের পাহাড় আজ দেশের প্রতিটি নাগরিকের কাঁধে এক দুঃসহ ভার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ঋণের বোঝা কেবল শুষ্ক পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি আমাদের আগামীর সক্ষমতাকে প্রতিনিয়ত পিষ্ট করছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের আশঙ্কাজনক হ্রাস, মুদ্রাস্ফীতির করাল গ্রাস এবং ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর দশা মিলে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস আমাদের বারবার শিখিয়েছে যে, চরম অন্ধকার থেকেই ভোরের সূর্যের উদয় হয়। যখন একটি রাষ্ট্র খাদের কিনারে এসে দাঁড়ায়, তখনই প্রয়োজন হয় এমন এক সাহসী নেতৃত্বের এবং সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনার, যা কেবল সাময়িক জোড়াতালি দেওয়া নয়, বরং সিস্টেমের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন দিনের সূচনা করবে। এই জটিল সমীকরণ বুঝতে হলে আমাদের এই শাস্ত্রের মূল দর্শনের দিকে তাকাতে হবে।
আধুনিক অর্থনীতির জনক অ্যাডাম স্মিথ তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য ওয়েলথ অব ন্যাশন’-এ অর্থনীতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, “অর্থনীতি এমন একটি বিজ্ঞান যা জাতিসমূহের সম্পদের প্রকৃতি ও কারণ অনুসন্ধান করে।” অর্থাৎ, সংকট থেকে উত্তরণের পথ হলো সম্পদের সঠিক উৎস খুঁজে বের করা এবং তার সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের বর্তমান বাজেট সেই সম্পদের উৎস এবং বণ্টনের একটি সাহসী রূপরেখা। ১৯২৯ সালের অক্টোবর মাসে মার্কিন শেয়ার বাজারে যে ধস নেমেছিল, তা বিশ্বকে ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ বা মহামন্দার কবলে ঠেলে দিয়েছিল। বেকারত্ব ২৫ শতাংশে পৌঁছেছিল, ব্যাংকগুলো একের পর এক দেউলিয়া হচ্ছিল। ঠিক সেই সময়ে ১৯৩৩ সালে ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার সামনে ছিল এক মহা ধ্বংসস্তূপ।
রুজভেল্ট তখন তার ঐতিহাসিক ‘নিউ ডিল’ ঘোষণা করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, পুঁজিবাদ যখন থমকে দাঁড়ায়, তখন রাষ্ট্রকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হয়। তিনি তার পরিকল্পনায় ত্রাণ (রিলিফ), পুনরুদ্ধার (রিকভারি) এবং সংস্কার (রিফর্ম)—এই তিনটি স্তম্ভের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। রুজভেল্ট তখন লক্ষ লক্ষ বেকার যুবকের হাতে কাজ তুলে দিয়ে মার্কিন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার খসড়া বাজেটটিও একটি সম্প্রসারণমূলক দর্শন নিয়ে সাজানো হয়েছে। রুজভেল্ট বলেছিলেন, “আমাদের একমাত্র ভয়ের বিষয় হলো ভয় নিজেই।” হয়তোবা বর্তমান সরকার মনে করেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও সেই ভয় জয় করে সংস্কারের পথে হাঁটতে হবে।
রুজভেল্টের সেই মহাপরিকল্পনা যেমন আমেরিকাকে বিশ্বের সুপারপাওয়ার হওয়ার ভিত গড়ে দিয়েছিল, বাংলাদেশের বর্তমান বাজেটটিও হতে পারে উন্নয়নের ‘ট্রাম্পকার্ড’। এই বাজেট ধাবিত হচ্ছে একটি মহাপরিকল্পনা নিয়ে, যার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গবেষণালব্দ ফল ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের গভীর দর্শন। অর্থনীতির একটি সাধারণ নিয়ম হলো, সাধারণ মানুষের হাতে ক্রয়ক্ষমতা না থাকলে বাজার সচল থাকে না। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ লর্ড জন মেনার্ড কেইনস তার ‘জেনারেল থিওরি’-তে উল্লেখ করেছেন যে, মন্দার সময়ে কার্যকর চাহিদা (ইফেকটিভ ডিমান্ড) বৃদ্ধির জন্য সরকারের ব্যয় বাড়ানো অপরিহার্য। অর্থাৎ, অর্থনীতি হলো এমন এক ব্যবস্থা যেখানে সরকারি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে পূর্ণ নিয়োগ এবং চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব। যখন সাধারণ মানুষ পণ্য কিনতে পারে না, তখন শিল্পোৎপাদন কমে যায় এবং বেকারত্ব বাড়ে। বর্তমান বাজারে যখন নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া, তখন প্রান্তিক মানুষের হাতে নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়া সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই সংকট নিরসনে তারেক রহমান সরকারের এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হলো দুই কার্ড নীতি—ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড। প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, প্রায় ৫০ লক্ষ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হচ্ছে। প্রতিটি পরিবারকে মাসে ২,৫০০ টাকা করে সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গড় পরিবার সদস্য সংখ্যা ৪.২৬ হিসেবে ধরলে প্রায় ২ কোটি ৬ লাখ মানুষ সরাসরি এর সুফল পাবে। এটি কেবল একটি মানবিক সাহায্য নয়; এটি একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কৌশল। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর হাতে যখন নগদ টাকা থাকবে, তারা স্থানীয় বাজার থেকে পণ্য কিনবে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে সরাসরি প্রাণসঞ্চার করবে এবং কেইনসীয় তত্ত্ব অনুযায়ী বাজারে চাহিদার সৃষ্টি করবে। এরপরে কৃষক কার্ড যা ঘটাতে পারে কৃষি বিপ্লব। “কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ, সুজলা সুফলা বাংলাদেশ।” এই চিরন্তন সত্যকে সামনে রেখে কৃষকদের বছরে ২,৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়ার জন্য কৃষক কার্ডের পাইলট কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও কৃষকরা বরাবরই অবহেলিত। এই কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের পকেটে টাকা পৌঁছালে তারা উন্নত বীজ, সার ও সেচ সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে পারবে। এটি সরাসরি জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের লুণ্ঠন প্রক্রিয়া চিরতরে বন্ধ করবে। বর্তমানে এই সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে বিগত সরকারের ৩০ লাখ কোটি টাকার লুণ্ঠন ও ঋণের বোঝা পেয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের মতে, বিগত সরকারের এই অপরিণামদর্শী ঋণের ফলে বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ তৈরি হয়েছে। এই বিশাল অংকের টাকা যদি আমরা কেবল ঋণের সুদ দিতেই ব্যয় করি, তবে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। মন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, “আকাশ থেকে টাকা পড়বে না; কঠোর পরিশ্রম এবং স্থিতিশীল পরিবেশের মাধ্যমেই এই অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে হবে”।
এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তাবিত খসড়া বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। এই বাজেটে উন্নয়ন খাতে ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ‘বিশেষ সামাজিক নিরাপত্তায় সহায়তা’ নামে ১৭ হাজার কোটি টাকা এবং ‘বিশেষ থেকে বরাদ্দ’ নামে ২০ হাজার কোটি ১০ লাখ টাকা রাখা হয়েছে, যা সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পালনের বলিষ্ঠ প্রতিফলন।
এই পরিমাণ অর্থায়ন যেমন অর্থনীতির গতি বাড়াবে, তেমনি মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
তবে কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সাবেক প্রভাষক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









