দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত সাম্প্রতিক উদ্বেগ নতুন কোনো বিতর্ক নয়, তবে উপস্থাপিত পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে গভীর চিন্তার বিষয়। সরকারের প্রথম ১০০ দিনের বিভিন্ন অপরাধসংক্রান্ত তথ্য কেবল রাজনৈতিক সমালোচনার বিষয় নয়; বরং নাগরিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
টিআইবির একটি প্রতিবেদন দেখা যায়, সরকারের ১০০ দিনে দেশে অপরাধের গ্রাফ আকাশচুম্বী হয়েছে। যার মধ্যে কেবল মার্চ ও এপ্রিল মাসেই দেশে মোট ৬০৫টি খুন, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি এই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে খোদ পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি এবং চুরির ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ২১৪টি।
দেশের নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার চরম বিপর্যয় ঘটেছে। আলোচিত সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৪৯৬টি। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ থেকে ১০২ জন, গণধর্ষণের নির্মম শিকার হয়েছেন ৩০ থেকে ৩৬ জন এবং ধর্ষণের শিকার শিশুর সংখ্যা ৪৯ থেকে ৭১ জন। এই পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দেয় যে গত তিন মাসে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থা কতটা নাজুক ও ভয়াবহ। হত্যা, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি, চুরি কিংবা নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধের সংখ্যা সত্যিই উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং জনগণের মানসিক নিরাপত্তাবোধের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
একটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার জীবন, সম্পদ ও মর্যাদা কতটা নিরাপদ—এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ। ধর্ষণ, গণধর্ষণ এবং শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয় না; এটি সমাজের নৈতিক ও মানবিক সংকটকেও সামনে নিয়ে আসে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর বিচার নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন— সংখ্যা যতই উদ্বেগজনক হোক, সেগুলোর যথাযথ উৎস, পদ্ধতি ও প্রেক্ষাপটও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সময়ের অপরাধচিত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সময়ের তুলনামূলক তথ্য, মামলার নথিভুক্তির হার এবং জনসংখ্যাগত বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হয়। ফলে এই পরিসংখ্যানগুলো নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা ও তথ্যভিত্তিক জবাব দেওয়া প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন মানুষ নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে, বিনিয়োগ করতে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি হলো কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা। অতএব, বর্তমান পরিস্থিতি রাজনৈতিক বাকবিতণ্ডার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবসম্মত সমাধানের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
অপরাধ দমনে গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি, পুলিশের আধুনিকায়ন, বিচারপ্রক্রিয়ার গতি বাড়ানো, নারী ও শিশু সুরক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা সময়ের দাবি। রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সর্বোপরি জনগণের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার আলোকে বিবেচনা করা উচিত। কারণ নিরাপদ বাংলাদেশ গঠন কোনো দল বা সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার সম্মিলিত অঙ্গীকার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









