বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির গভীর বন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত পরিস্থিতি, কথিত পুশইন, এবং ভারতে মুসলমানদের ওপর হামলা ও বৈষম্যের অভিযোগ ঘিরে দুই দেশের জনগণের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্র যে সংযম, সহিষ্ণুতা এবং দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছে, তা শুধু প্রশংসনীয়ই নয়; বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
ভারতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা কিংবা মসজিদকেন্দ্রিক সংঘাতের খবর নিয়মিত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে আসে। এসব ঘটনা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য আত্মসমালোচনার বিষয়। তবে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট বা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিক্রিয়ায় অন্য দেশে প্রতিশোধমূলক সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে পড়া কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বাংলাদেশে বৃহৎ পরিসরে এমন প্রতিশোধমূলক সহিংসতা না ঘটার পেছনে রাষ্ট্রীয় নজরদারি, সামাজিক সচেতনতা এবং দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে বাংলাদেশেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হামলা, মন্দির ভাঙচুর, জমি দখল কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে এবং এখনো ঘটে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো ধর্ম, বর্ণ বা পরিচয় নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো অপরাধকে সাম্প্রদায়িক রং দিয়ে আড়াল করা যেমন ভুল, তেমনি সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধকে সাধারণ অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতাও বিপজ্জনক।
সাম্প্রতিক সীমান্ত পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ অভিযোগ করছে, সীমান্তে জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। যদি কোনো ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক হন, তবে তাদের বাংলাদেশে পাঠানোর প্রশ্নই আসে না। আবার কেউ যদি বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকেন, তাহলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ। সীমান্তে একতরফা পদক্ষেপ কখনোই সমস্যার সমাধান নয়; বরং তা অবিশ্বাস ও উত্তেজনা বাড়ায়।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—উসকানির মুখেও সংযম বজায় রাখা। সীমান্তে দায়িত্বশীল আচরণ, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাই দুই দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। বাংলাদেশ সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধির পরিবর্তে আন্তর্জাতিক নীতি ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান চেয়েছে। এই অবস্থানকে দুর্বলতা নয়, বরং পরিণত রাষ্ট্রনৈতিক আচরণ হিসেবে দেখা উচিত। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারণা, গুজব এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবণতা সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
একটি দেশের অন্যায়ের প্রতিকার আরেকটি দেশের নিরীহ নাগরিকদের ওপর হামলা হতে পারে না। প্রকৃত সভ্যতা ও মানবিকতার পরিচয় প্রতিশোধে নয়, ন্যায়বিচারে। বাংলাদেশের শক্তি তার বহুত্ববাদ, সহাবস্থান এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্যে। সেই ঐতিহ্য রক্ষা করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্বও। প্রতিবেশী দেশের কোনো ঘটনা যেন আমাদের সমাজে বিভেদ, ঘৃণা বা সহিংসতার কারণ না হয়, সেদিকে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
প্রতিবেশী দেশের ভুলের প্রতিক্রিয়ায় একই ভুল করা কোনো সমাধান নয়। ঘৃণার জবাব ঘৃণা দিয়ে নয়, ন্যায়বিচার ও মানবিকতা দিয়েই দিতে হয়। বাংলাদেশের সামনে আজ সেই পরীক্ষাই উপস্থিত। এখন পর্যন্ত দেশের মানুষ ও রাষ্ট্র যে সংযমের পরিচয় দিয়েছে, তা ধরে রাখতে পারলে বাংলাদেশ শুধু নিজের মর্যাদাই রক্ষা করবে না, বরং সমগ্র অঞ্চলের জন্য একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হবে। আক্রমণ উসকে দিতে পারে সংঘাত, কিন্তু সংযম সৃষ্টি করে নৈতিক শক্তি। আর ইতিহাস সাক্ষী—শেষ পর্যন্ত নৈতিক শক্তির কাছেই আগ্রাসন পরাজিত হয়। সর্বোপরি দুই দেশের সম্পর্ক রক্ষায় নৈতিকতার পরিচয় দিতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









