দেশের সড়কে প্রাণহানি যেন এক ভয়াবহ নিত্যবাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে ৬১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬২২ জন মানুষের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৬৫২ জন আহত হওয়ার ঘটনা গভীর উদ্বেগের বিষয়। একই সময়ে রেল ও নৌপথের দুর্ঘটনা যোগ করলে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৭১ জন। এসব সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং একটি জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, দুর্ঘটনার এই ধারাবাহিকতা দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় বাস্তবায়িত হয়নি। জাতীয় মহাসড়কে সর্বাধিক দুর্ঘটনা সংঘটিত হওয়া এবং মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশি হওয়া প্রমাণ করে যে সড়ক ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ এবং সচেতনতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।
দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুখোমুখি সংঘর্ষ, গাড়িচাপা এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়ার ঘটনাই সবচেয়ে বেশি। এর পেছনে রয়েছে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া ওভারটেকিং, চালকদের ক্লান্তি, অদক্ষতা, অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এবং সড়ক অবকাঠামোর দুর্বলতা। অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখা হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পথচারী, শিক্ষার্থী, নারী ও শিশু রয়েছেন। একটি সভ্য সমাজে সড়ক ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক মহাসড়কে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নেই, ফুটপাত দখলমুক্ত নয় এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পর্যাপ্ত নয়।
যাত্রী কল্যাণ সমিতি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যে সুপারিশগুলো দিয়েছে, তার বেশিরভাগই দীর্ঘদিনের আলোচিত বিষয়। চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সড়কের মানোন্নয়ন, রোড সেফটি অডিট, ফিটনেস ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা—এসব আর নতুন দাবি নয়; বরং সময়ের অপরিহার্য প্রয়োজন।
বিশেষ করে চালকদের কর্মঘণ্টা ও ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা জরুরি, কারণ অতিরিক্ত কাজের চাপ ও ক্লান্তি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এছাড়া পরিবহন খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও জরুরি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিআরটিএ, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। শুধু দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন কিংবা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দিয়ে দায় এড়ানো যাবে না; প্রয়োজন জবাবদিহিমূলক ও টেকসই পদক্ষেপ।
ঈদযাত্রা সামনে রেখে পরিস্থিতি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, উৎসবকেন্দ্রিক অতিরিক্ত যানচাপ এবং অনিয়মের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই এখনই স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হতে হবে।
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু উঁচু সেতু, প্রশস্ত মহাসড়ক বা আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; সেই উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ। সড়ক দুর্ঘটনা কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়; এটি প্রতিরোধযোগ্য। প্রতি মাসে শত শত মানুষের প্রাণহানি কোনো স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না। সড়কে মৃত্যু নিয়তি নয়, এটি প্রতিরোধযোগ্য।
তাই প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রয়োগ, আধুনিক অবকাঠামো এবং সর্বস্তরের সচেতনতা। প্রতিদিন সড়কে শত শত মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে উন্নয়নের গল্প পূর্ণতা পায় না। আর একটি প্রাণও যেন অবহেলা, অনিয়ম বা দায়িত্বহীনতার কারণে ঝরে না পড়ে। পরিসংখ্যান নয়, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। মানুষের জীবনের মূল্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সড়ক নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করাই আজ সময়ের দাবি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









