উন্নয়ন প্রকল্প কোনো কাগুজে স্বপ্ন নয়; এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে নাগরিকের জীবনমান পরিবর্তনের একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়া। আর সেই প্রক্রিয়ার প্রথম ও অপরিহার্য শর্ত হলো অর্থায়নের নিশ্চয়তা। অর্থ, অনুমোদন এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা ছাড়া কোনো প্রকল্প কেবল একটি পরিকল্পনা বা সম্ভাবনার বেশি কিছু নয়। কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) চিত্র ভিন্ন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মোট ১ হাজার ১০৮টি প্রকল্পের মধ্যে ১ হাজার ৬৩টির জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই, ১৭৯টি প্রকল্প এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে এবং ৭৭টি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র এক লাখ টাকা। অর্থাৎ উন্নয়নের যে বিশাল রূপরেখা কাগজে উপস্থাপিত হয়েছে, তার উল্লেখযোগ্য অংশের বাস্তবায়নভিত্তি এখনো অনিশ্চিত। এই পরিসংখ্যান কেবল প্রশাসনিক তথ্য নয়; এটি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে।
যে প্রকল্পের অর্থায়ন নিশ্চিত নয়, অনুমোদন সম্পন্ন হয়নি এবং বাস্তবায়নের প্রস্তুতিও নেই, সেটি কীভাবে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হয়ে ওঠে? আরও বড় প্রশ্ন হলো, উন্নয়নের লক্ষ্য কি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্জিত হবে, নাকি ক্রমশ দীর্ঘতর হতে থাকা প্রকল্পতালিকার ভিড়ে হারিয়ে যাবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই আজ জরুরি, কারণ উন্নয়নের সাফল্য প্রকল্পের সংখ্যায় নয়, বরং সেগুলোর সময়মতো ও কার্যকর বাস্তবায়নের মধ্যেই নিহিত।
প্রশ্ন উঠছে, যে প্রকল্পের অর্থ নেই, অনুমোদন নেই, এমনকি অর্থায়নের উৎসও নিশ্চিত নয়, সেটি কীভাবে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হয়? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, উন্নয়নের লক্ষ্য কি বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পের মাধ্যমে অর্জিত হবে, নাকি ক্রমবর্ধমান এক দীর্ঘ প্রকল্পতালিকার মধ্যে হারিয়ে যাবে?
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) একটি দেশের উন্নয়ন দর্শন, অগ্রাধিকার ও সক্ষমতার প্রতিফলন। কিন্তু প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপির পরিসংখ্যান সেই সক্ষমতা সম্পর্কে স্বস্তির চেয়ে উদ্বেগই বেশি তৈরি করছে। মোট ১ হাজার ১০৮টি প্রকল্পের মধ্যে ১ হাজার ৬৩টি প্রকল্পের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। আরও ১৭৯টি প্রকল্প এখনো অনুমোদন পায়নি, আর ৭৭টি প্রকল্প টিকে আছে মাত্র এক লাখ টাকার প্রতীকী বরাদ্দে। অর্থাৎ উন্নয়নের বিশাল এক অংশ কাগজে আছে, কিন্তু তার বাস্তব ভিত্তি অনিশ্চিত।
প্রশ্ন হলো, অর্থ নেই, অনুমোদন নেই, অর্থায়নের উৎসও নিশ্চিত নয়—তবু এসব প্রকল্প এডিপিতে স্থান পাচ্ছে কেন? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের একটি দুর্বলতা সামনে আসে। প্রকল্প গ্রহণে আমরা উদার, কিন্তু বাস্তবায়নে দুর্বল। নতুন প্রকল্প ঘোষণার আগ্রহ যতটা, পুরোনো প্রকল্প শেষ করার সক্ষমতা ততটা নয়। এডিপির তথ্য বলছে, বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর গড় বয়স প্রায় ছয় বছর।
শত শত প্রকল্প নির্ধারিত সময় অতিক্রম করেছে, অনেক প্রকল্প একাধিকবার সংশোধিত হয়েছে, আবার অনেক প্রকল্পের ব্যয় কয়েক দফা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি প্রতিষ্ঠিত প্রবণতা। পরিকল্পনা গ্রহণের সময় যে সময়সীমা ও ব্যয়ের হিসাব দেয়া হয়, বাস্তবে তার সঙ্গে বাস্তবায়নের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় জনগণের ওপর অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে চাপছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যেসব প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা, সেগুলোর বড় অংশই নির্ধারিত সময়ে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এর অর্থ হলো আগামী বছরও সেগুলো বহাল থাকবে, আবারও সময় বাড়বে, আবারও ব্যয় বাড়বে। একদিকে নতুন প্রকল্প যুক্ত হবে, অন্যদিকে পুরোনো প্রকল্প ঝুলে থাকবে। ফলে প্রকল্পের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে, কিন্তু উন্নয়নের গতি বাড়বে না। অবশ্য পরিকল্পনা কমিশন ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের একটি যুক্তি রয়েছে। তারা বলছেন, বর্তমান সরকার সীমিত সময়ের মধ্যে বাজেট ও এডিপি প্রণয়ন করেছে। অনেক প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুতি এবং অর্থায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তাই ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নের কথা মাথায় রেখে এসব প্রকল্পকে তালিকাভুক্ত রাখা হয়েছে। যুক্তিটির বাস্তবতা আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যতিক্রম কি ধীরে ধীরে নিয়মে পরিণত হচ্ছে না?
এডিপি কোনো সম্ভাব্য ইচ্ছার তালিকা নয়; এটি হওয়া উচিত বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা। সেখানে বিপুলসংখ্যক বরাদ্দহীন ও অননুমোদিত প্রকল্পের উপস্থিতি পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার গুণগত মান নিয়েই প্রশ্ন তোলে। কারণ উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল কাজ হচ্ছে অগ্রাধিকার নির্ধারণ। কিন্তু যখন তালিকায় সবকিছুর জন্য জায়গা থাকে, তখন প্রকৃত অগ্রাধিকার হারিয়ে যায়। এর সুযোগে রাজনৈতিক বিবেচনা, প্রশাসনিক প্রভাব কিংবা বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর চাপও সহজেই প্রবেশ করে। বাংলাদেশ এখন সীমিত সম্পদ, রাজস্ব সংকট এবং বৈদেশিক অর্থায়নের অনিশ্চয়তার বাস্তবতার মুখোমুখি। এই পরিস্থিতিতে প্রকল্প গ্রহণে আরও বেশি সতর্কতা প্রয়োজন। যে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত, অর্থায়নের উৎস নিশ্চিত এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা বিদ্যমান—সেই প্রকল্পই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। একই সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। প্রয়োজন হলে সেগুলো বাতিল করার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সাহসও দেখাতে হবে।
উন্নয়নের সাফল্য প্রকল্পের সংখ্যায় নয়, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও ফলাফলে পরিমাপ করা উচিত। এডিপি যদি বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনার পরিবর্তে সম্ভাবনার দীর্ঘ তালিকায় পরিণত হয়, তবে তা জাতীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এখন সময় এসেছে কাগুজে উন্নয়নের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবভিত্তিক, অগ্রাধিকারনির্ভর এবং জবাবদিহিমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠার। কাগজে উন্নয়নের স্বপ্ন আঁকা সহজ। কঠিন হলো সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









