ডেঙ্গুর প্রকোপ যখন দেশে বাড়ছে, তখন নতুন করে শঙ্কা জাগাচ্ছে চিকুনগুনিয়া। একই এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ানো এই দুই রোগের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণও দ্রুত বাড়তে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করলেও চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহে এখনো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তদের কোনো সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার তৈরি হয়নি। নিয়মিতভাবে ডেঙ্গুর তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হলেও চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থা কার্যকর নেই। এমনকি কোনো হাসপাতাল বা জেলা থেকে এখন পর্যন্ত চিকুনগুনিয়া শনাক্তকরণ কিটের চাহিদাও তেমনভাবে আসেনি। অথচ রোগের বিস্তার সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলে পরিস্থিতি কতটা গুরুতর, তা বোঝা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন।
বাংলাদেশে চিকুনগুনিয়া নতুন কোনো রোগ নয়। ২০০৮ সালে প্রথম শনাক্ত হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে ছোটখাটো প্রাদুর্ভাব হয়েছে। ২০১৭ সালে ১৭ জেলায় বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর কয়েক বছর রোগটি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে ঢাকায় আবার রোগটি শনাক্ত হয় এবং ২০২৫ সালে সংক্রমণ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সরকারি হিসাবেই গত বছরের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আট মাসে ১৯ হাজার ৪৯০ জন চিকুনগুনিয়া রোগী শনাক্ত হয়েছেন। পর্যাপ্ত পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চিকুনগুনিয়াকে অনেকেই তুলনামূলক কম প্রাণঘাতী রোগ হিসেবে দেখেন। কিন্তু এতে ভোগান্তি মোটেও কম নয়। জ্বরের পাশাপাশি তীব্র গিঁটের ব্যথা, পেশিতে ব্যথা ও মাথাব্যথা দেখা দিতে পারে। অনেক রোগীর গিঁটের ব্যথা দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়। শিশু, বয়স্ক এবং ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা কিডনি রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকিও বেশি। তাই মৃত্যুহার কম—এই যুক্তিতে রোগটিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
চিকুনগুনিয়া মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ। শুধু ফগিং করে এডিস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাড়িঘর, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রেনসহ যেসব স্থানে পানি জমে থাকে, সেসব জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার ও নজরদারির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সারা বছর লার্ভা ধ্বংস, এডিস জরিপ এবং মশা নিধনের ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে হবে।
সরকার মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটি পুনর্গঠন করেছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে কমিটি গঠন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; এর কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান হতে হবে। স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো, রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর তৎপর হওয়ার পুরোনো সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া—দুই রোগের বিরুদ্ধেই লড়াইয়ের মূল জায়গা একই: এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ। তাই এখনই কার্যকর নজরদারি, পর্যাপ্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা, নির্ভুল তথ্যভাণ্ডার এবং বছরব্যাপী মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি নিশ্চিত করতে হবে। আগাম প্রস্তুতি নেওয়া গেলে বড় সংকট এড়ানো সম্ভব। কিন্তু অবহেলা করলে ডেঙ্গুর সঙ্গে চিকুনগুনিয়াও দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় বোঝা হয়ে উঠতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









