ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনেই যে দৃশ্য দেখা গেল, তা কেবল হট্টগোল নয়- এটি আমাদের সংসদীয় রাজনীতির গভীর অসুস্থতার বহিঃপ্রকাশ। একজন মন্ত্রীর কটাক্ষ, বিরোধী দলের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া, পাল্টাপাল্টি বাক্যবাণ এবং শেষ পর্যন্ত স্পিকারের কণ্ঠে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ- সব মিলিয়ে প্রশ্নটি এখন খুব সরল; এই সংসদ কি জনগণের কথা বলার জায়গা হবে, নাকি পরস্পরকে হার মানানোর মঞ্চে পরিণত হবে?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের ধরন নিয়ে আপত্তির যথেষ্ট কারণ আছে। ‘শাহবাগ স্কয়ারে বক্তা’ কিংবা ‘পল্টনের বক্তৃতা’- এ ধরনের শব্দচয়ন সংসদে একজন মন্ত্রীর কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়। সংসদে প্রশ্ন করা বিরোধী দলের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। প্রশ্ন কঠিন হতে পারে, ভাষা আক্রমণাত্মকও মনে হতে পারে; কিন্তু তার জবাব হওয়া উচিত তথ্য ও যুক্তিতে, বিদ্রূপে নয়।
মন্ত্রী যদি প্রশ্নকে ‘বক্তৃতা’ বলে খাটো করেন, তাহলে তিনি আসলে শুধু একজন সংসদ সদস্যকে নয়, সংসদীয় প্রশ্নোত্তর ব্যবস্থাকেও খাটো করেন। তবে এখানেই বিরোধী দলের দায় শেষ হয়ে যায় না। প্রতিবাদের নামে এমন হট্টগোল করা, যাতে একজন বক্তার বক্তব্যই শোনা যায় না, সেটিও গণতন্ত্রের সৌন্দর্য নয়। বরং এটি সেই একই অসহিষ্ণুতার আরেক রূপ, যার বিরুদ্ধে বিরোধী দল নিজেই প্রতিবাদ করছে। সরকারের ঔদ্ধত্যের প্রতিবাদ করতে গিয়ে যদি বিরোধী দলও সংসদীয় শৃঙ্খলা ভাঙে, তাহলে জনগণের সামনে পার্থক্যটি কোথায় থাকে?
বিরোধীদলীয় নেতা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আচরণকে ‘পার্লামেন্টারিয়ান ফ্যাসিজম’ বলেছেন। শব্দটি রাজনৈতিকভাবে বিস্ফোরক। সংসদে ক্ষমতাসীনদের দম্ভ, বিরোধী মতকে অবজ্ঞা কিংবা প্রশ্নকে তুচ্ছ করার প্রবণতা অবশ্যই উদ্বেগের। কিন্তু ‘ফ্যাসিজম’ শব্দটি ব্যবহার করলেই সংসদীয় প্রতিরোধের দায়িত্ব শেষ হয় না। গণতন্ত্র রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো- তথ্য, যুক্তি, বিকল্প নীতি এবং ধারাবাহিক রাজনৈতিক জবাবদিহি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো স্পিকারের বক্তব্য।
সংসদে বসে একজন স্পিকার যদি বলেন, ‘এই সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি চিন্তিত’, তাহলে সেটিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, সংসদীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিপদ শুরু হয় তখনই, যখন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একে অপরের কথা শুনতে অস্বীকার করেন। আজ মাইক্রোফোনের বদলে যদি চিৎকার করে কথা বলে, আগামীকাল যুক্তির বদলে শক্তি কথা বলবে।
ইতিহাসও আমাদের সতর্ক করে। ১৯৫৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে সংঘর্ষের মধ্যে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী পাটোয়ারীর মৃত্যুর ঘটনা প্রমাণ করে, সংসদীয় অসহিষ্ণুতা কখনো কখনো ভয়াবহ পরিণতিতে পৌঁছাতে পারে। ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায় স্মরণ করার অর্থ হলো- রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখা শুরু হলে প্রতিষ্ঠান নিরাপদ থাকে না।
আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার: সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কারও জন্য লাইসেন্স নয়, আবার সংখ্যালঘু হওয়াও কাউকে সংসদ অচল করার অধিকার দেয় না। সরকারকে সমালোচনা সহ্য করতে হবে; বিরোধী দলকে নিয়ম মেনে সেই সমালোচনা করতে হবে। ক্ষমতাসীনদের মনে রাখতে হবে, আজকের সংখ্যাগরিষ্ঠতা চিরস্থায়ী নয়। বিরোধী দলকেও মনে রাখতে হবে, প্রতিবাদ করার অধিকার আর বিশৃঙ্খলা করার অধিকার এক জিনিস নয়।
সংসদে কেউ কারো শিক্ষক নন, কেউ কারো ছাত্রও নন। সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধি। মন্ত্রীও জনগণের প্রতিনিধি, বিরোধীদলীয় নেতাও জনগণের প্রতিনিধি। তাই সংসদে ‘কে কাকে শেখাবে’- এই অহংকারের কোনো স্থান নেই। জনগণ কাউকে শিক্ষক বানিয়ে পাঠায়নি; পাঠিয়েছে তাদের পক্ষে কথা বলতে। এই সংসদের সামনে এখন একটি কঠিন পরীক্ষা। প্রথম অধিবেশনের উত্তাপ কি আগামী দিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পূর্বাভাস হবে, নাকি এখান থেকেই একটি নতুন সংসদীয় শিষ্টাচারের সূচনা হবে- সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে।
কারণ, সংসদে চেয়ার ভাঙা, টেবিল চাপড়ানো কিংবা মাইক্রোফোনের ওপর চিৎকার করা যতটা সহজ, জনগণের আস্থা অর্জন করা ততটাই কঠিন। সংসদ কোনো দলের ব্যক্তিগত মঞ্চ নয়। এটি জনগণের প্রতিষ্ঠান। সেখানে যার কণ্ঠ সবচেয়ে জোরে, তার কথা সবচেয়ে সত্য- এমন গণতন্ত্র আমরা চাই না। আমরা চাই, যার যুক্তি সবচেয়ে শক্তিশালী, জনগণের কাছে তার কথাই সবচেয়ে বেশি ওজন পাবে। সংসদকে বাঁচাতে হলে প্রথমে অহংকারকে নামাতে হবে। মন্ত্রীকে শুনতে হবে, বিরোধী দলকে শুনতে হবে, স্পিকারকে মানতে হবে। কারণ, সংসদে কেউ যদি কারো কথা শুনতে রাজি না থাকে, শেষ পর্যন্ত জনগণের কথাটাই আর শোনা যাবে না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









