বিদ্যুৎ সংকট এখন আর কেবল আলো-আঁধারির সমস্যা নয়; এটি ক্রমেই মানবিক সংকটে পরিণত হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং, অনিশ্চিত সরবরাহ এবং ব্যাকআপ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা জনজীবনের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসাকে গভীরভাবে আঘাত করছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরও গ্রাহক নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পাচ্ছেন না। ফলে প্রশ্ন উঠছে- উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরও কেন বিদ্যুৎ সংকট কাটছে না?
বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্ট স্বাস্থ্যসেবা খাতে। একটি শিশুর নেবুলাইজেশন কয়েক ঘণ্টা পিছিয়ে যাওয়া, অস্ত্রোপচারের মাঝখানে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া কিংবা এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি বন্ধ থাকা নিছক সেবা বিঘ্ন নয়; কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। হাসপাতালের জেনারেটর থাকলেই যে সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব, বাস্তবতা তা বলে না। কোথাও জ্বালানি নেই, কোথাও ব্যাটারি নষ্ট, কোথাও আবার দীর্ঘদিন ধরে জেনারেটর অচল। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দুর্বলতা হাসপাতালের ব্যাকআপ ব্যবস্থাকেও অকার্যকর করে তুলছে।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় উপজেলা ও গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো। বড় শহরের হাসপাতালগুলো তুলনামূলকভাবে একাধিক সংযোগ ও বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সুবিধা পেলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি হাসপাতালের একমাত্র জেনারেটরটি অচল হলেই কার্যত পুরো সেবা ব্যবস্থা থমকে যেতে পারে। এর ফলে চিকিৎসার বৈষম্য আরো বাড়বে। সামর্থ্যবান রোগী বেসরকারি হাসপাতাল বা জেলা শহরে যেতে পারবেন; দরিদ্র রোগীকে অপেক্ষা করতে হবে। বিদ্যুৎ সংকট তখন শুধু বিদ্যুতের বৈষম্য নয়, চিকিৎসার বৈষম্যও তৈরি করবে।
সংকটের মূল কারণও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহ ঘাটতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর আর্থিক চাপ, বকেয়া পাওনা এবং উচ্চমূল্যের জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা- সব মিলিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা ও বাস্তব উৎপাদনের মধ্যে বড় ফারাক তৈরি হয়েছে। হাজার হাজার মেগাওয়াট স্থাপিত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি জ্বালানির অভাবে কেন্দ্র বসে থাকে, তবে কাগজে থাকা সক্ষমতা দিয়ে মানুষের ঘর আলোকিত করা সম্ভব নয়।
এই সংকটের অর্থনৈতিক মূল্যও কম নয়। রাইস মিল, কোল্ড স্টোরেজ, সেচ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, বেকারি, ছাপাখানা থেকে শুরু করে ফার্মেসি, রেস্তোরাঁ এবং ডিজিটাল লেনদেন- সব ক্ষেত্রেই উৎপাদন ও ব্যবসা ব্যাহত হচ্ছে। বারবার মেশিন চালু-বন্ধ হওয়ায় উৎপাদনশীল সময় নষ্ট হচ্ছে, বাড়ছে জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয়। কৃষকের সেচ ব্যয় বাড়ছে, খাদ্য সংরক্ষণে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা লোকসান গুনছেন। অর্থাৎ বিদ্যুৎ সংকট অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে।
এ অবস্থায় শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রথমত, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। তৃতীয়ত, হাসপাতালসহ জরুরি সেবাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাকআপ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আলাদা অগ্রাধিকার দিতে হবে।
জেনারেটর কেনার পাশাপাশি জ্বালানি, ব্যাটারি, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে লোডশেডিংয়ের সময়সূচি স্বচ্ছ ও পূর্বঘোষিত হওয়া জরুরি।
বিদ্যুৎ একটি পণ্য মাত্র নয়; এটি আধুনিক রাষ্ট্রের মৌলিক অবকাঠামো এবং মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই ‘প্রাণের বাতি’ যেন বারবার নিবু-নিবু না করে, সে জন্য সাময়িক জোড়াতালি নয়- জ্বালানি, উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ ও ব্যবস্থাপনার সমন্বিত সংস্কার এখন সময়ের দাবি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









