‘কিতাব আল-ইসরা’। লেখক: শায়খ আল-আকবর মুহিউদ্দিন ইবন আল-আরাবি, সম্পাদনা: আহমেদ মুহাম্মদ আলি, আবরার আহমেদ শাহি, ইংরেজি অনবাদ: আবরার আহমেদ শাহি, প্রকাশক: ইবন আল-আরাবি ফাউন্ডেশন। ৩৫০ পৃষ্ঠার বইটির দাম ২,৬০০ রুপি।
মানুষের ইতিহাসে যাত্রা শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার নাম নয়। মানুষ বাইরে যত দূর ভ্রমণ করেছে, তার চেয়েও দীর্ঘ ভ্রমণ করেছে নিজের ভিতরে—নিজেকে বোঝার, নিজের সীমা অতিক্রম করার এবং দৃশ্যমান পৃথিবীর আড়ালে থাকা কোনো গভীর অর্থের সন্ধান করার চেষ্টায়।
ইবনুল আরাবির ‘কিতাব আল-ইসরা’ সেই অন্তর্গত যাত্রার একটি আধ্যাত্মিক রূপক।
এখানে পথ কোনো সাধারণ পথ নয়, গন্তব্যও কোনো নির্দিষ্ট স্থান নয়। যাত্রার অর্থ তৈরি হয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। মানুষ যখন পরিচিত জগতের সীমা পেরোয়, তখন আসলে সে নিজের পরিচিত সত্তারও সীমা পরীক্ষা করতে শুরু করে। এই কারণে বইটির গুরুত্ব কেবল তার আধ্যাত্মিক কাহিনিতে নয়; মানুষের জ্ঞান, সীমাবদ্ধতা এবং অদৃশ্যের প্রতি তার আকাঙ্ক্ষা নিয়েও এটি গভীরভাবে ভাবতে শেখায়।
আধ্যাত্মিক যাত্রার শুরু হয়তো কোনো রাস্তা থেকে নয়, একটি প্রশ্ন থেকে। মানুষ যখন নিজের পরিচিত পৃথিবীকে আর সম্পূর্ণ বলে মনে করতে পারে না, তখন তার ভিতরে প্রশ্ন জাগে—আমি কে? এই জগতের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী? দৃশ্যমান বাস্তবতার বাইরে কি আরও কোনো সত্য আছে?
ইবনুল আরাবির কাছে এই প্রশ্নগুলো পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। মানুষকে বুঝতে হলে তাকে জগতের মধ্যে দেখতে হয়; আবার জগতের অর্থ অনুসন্ধান করতে হলে মানুষের অবস্থানও বুঝতে হয়। এই দ্বৈত অবস্থানই মানুষকে বিশেষ করে তোলে। সে ক্ষণস্থায়ী, অথচ অনন্তের কথা ভাবতে পারে। তার শরীর সীমাবদ্ধ, অথচ তার কল্পনা সীমার বাইরে যেতে চায়।
‘কিতাব আল-ইসরা’ এই বৈপরীত্যের মধ্যেই মানুষের আধ্যাত্মিক সম্ভাবনাকে দেখতে চায়।
সাধারণ ভ্রমণে দূরত্ব মাপা যায়। আধ্যাত্মিক যাত্রায় তা যায় না। এখানে দূরে যাওয়া মানে চেতনার এক স্তর থেকে অন্য স্তরে যাওয়া। পরিচিত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা, নিজের নিশ্চিত বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা এবং অজানার সামনে দাঁড়ানো। এই কারণে জ্ঞানও এখানে একটি বিশেষ অর্থ পায়। মানুষ যত জানতে শেখে, ততই নিজের অজ্ঞতার বিস্তার বুঝতে পারে। সত্যকে পুরোপুরি আয়ত্ত করার বদলে সে তার সামনে নিজের সীমাবদ্ধতা অনুভব করে।
এটি জ্ঞানের পরাজয় নয়; বরং জ্ঞানের বিনয়। মানুষ বুঝতে পারে, পৃথিবী তার ধারণার চেয়ে বড় এবং তার নিজের অস্তিত্বও তার নিজের তৈরি সংজ্ঞার চেয়ে গভীর।
বইটির আধ্যাত্মিক পরিসরে আকাশ তাই শুধু মাথার ওপরের কোনো স্থান নয়। এটি উচ্চতার প্রতীক—উপলব্ধির উচ্চতা, আত্মিক প্রসারণ এবং দৃশ্যমানের সীমা অতিক্রম করে অদৃশ্যের দিকে তাকানোর ক্ষমতা।
মানুষ মাটিতে দাঁড়িয়ে আকাশের কথা ভাবে। এই সাধারণ দৃশ্যের মধ্যেই তার গভীর রহস্য লুকিয়ে আছে। একটি ক্ষুদ্র ও নশ্বর প্রাণী কীভাবে অসীমের কথা ভাবতে পারে? সম্ভবত মানুষের বিশেষত্ব এখানেই। সে জানে তার জীবন সীমিত, তবু সে অনন্তকে কল্পনা করে। সে জানে সবকিছু বুঝতে পারবে না, তবু জানতে চায়।
‘কিতাব আল-ইসরা’ এই আকাঙ্ক্ষাকে কোনো সহজ উত্তর দিয়ে থামিয়ে দেয় না। বরং প্রশ্নটিকে আরও গভীর করে। আকাঙ্খাকে অস্থির করে তোলে।
ইবনুল আরাবির মানুষ কোনো স্থির পরিচয়ের মধ্যে সম্পূর্ণ হয়ে যায় না। সে শরীর, কিন্তু শুধু শরীর নয়। সে পার্থিব জীবনের অংশ, অথচ তার আকাঙ্ক্ষা সেই জীবনের সীমা ছাড়িয়ে যেতে চায়। সে মৃত্যুশীল, কিন্তু অনন্তের অর্থ নিয়ে চিন্তা করে।

এই দ্বন্দ্বই মানুষের অস্তিত্বকে জটিল করে তোলে।
মানুষ নিজের সম্পর্কে একটি স্থির ধারণা তৈরি করতে চায়—আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাচ্ছি। কিন্তু জীবন তাকে বারবার বদলে দেয়। অভিজ্ঞতা, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, ভয়, মৃত্যু এবং জ্ঞান—সবকিছু তার সত্তার ওপর নতুন রেখা টেনে দেয়।
তাই আত্মপরিচয় কোনো বন্ধ ঘর নয়; এটি একটি চলমান পথ। এই দিক থেকে দেখলে আমরা বলতে পারি ‘কিতাব আল-ইসরা’–এর যাত্রা নিজের কাছ থেকেও দূরে যাওয়া এবং নিজের কাছে ফিরে আসার প্রক্রিয়া।
আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতাকে শুধু আলো পাওয়ার গল্প হিসেবে পড়লে ইবনুল আরাবির জগতের জটিলতা হারিয়ে যায়। আলোকে বোঝার জন্য অন্ধকারেরও প্রয়োজন আছে। অজ্ঞতা জ্ঞানের প্রয়োজন অনুভব করায়। হারিয়ে যাওয়া পথের অর্থ শেখায়। অপেক্ষা মানুষকে বুঝতে সাহায্য করে যে সব সত্য তার ইচ্ছামতো প্রকাশিত হয় না।
এই কারণে আধ্যাত্মিক যাত্রা কোনো সরল উত্থান নয়। তার মধ্যে সংশয় ও অনিশ্চয়তাও থাকে। কখনো মানুষ দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়, কিন্তু দরজা খোলে না। তবু সেই অপেক্ষা অর্থহীন নয়। কারণ সত্যকে অধিকার করার চেয়ে তার দিকে এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিটি যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়তো ফিরে আসা। দূরে গিয়ে মানুষ যখন নিজের পরিচিত পৃথিবীতে ফিরে আসে, পৃথিবীটি সাধারণত বদলায় না। বদলে যায় তার চোখ। একই ঘর, একই রাস্তা, একই মানুষের মুখ—কিন্তু তাদের অর্থ আর আগের মতো থাকে না।
এই প্রত্যাবর্তন ‘কিতাব আল-ইসরা’–কে নিছক রহস্যময় ভ্রমণকাহিনি থেকে আলাদা করে। আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মূল্য শুধু অদৃশ্য কোনো জগতের দর্শনে নয়; সেই অভিজ্ঞতা মানুষকে তার দৃশ্যমান জীবনে কীভাবে ফিরিয়ে আনে, তার মধ্যেও।
অদৃশ্যের দিকে যাত্রা যদি দৃশ্যমান পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে না শেখায়, তবে সেই যাত্রার অর্থই বা কী? ফিরে আসাই তাই এক ধরনের পরীক্ষা।
আজকের মানুষ পৃথিবীকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত অতিক্রম করতে পারে। প্রযুক্তি দূরত্ব কমিয়েছে, তথ্যের পরিমাণ বাড়িয়েছে, জগতকে আমাদের হাতের কাছে এনে দিয়েছে।
কিন্তু নিজের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব কি কমেছে? সম্ভবত নয়। আমরা অনেক কিছু জানি, কিন্তু সব জানার পরও প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, এবং এই জীবনের অর্থ কী? এই জায়গায় ইবনুল আরাবির বই সমকালকে স্পর্শ করে। তিনি আমাদের সময়ের উত্তর দেননি, কিন্তু এমন কিছু প্রশ্নের কাছে ফিরিয়ে নেন, যেগুলো কোনো একটি যুগের সম্পত্তি নয়।
মানুষ কে? তার সীমা কোথায়? সে যে অর্থের সন্ধান করে, সেই অর্থ কি কেবল দৃশ্যমান পৃথিবীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ? এই প্রশ্নগুলোই বইটিকে আজও পাঠযোগ্য করে রাখে।
‘কিতাব আল-ইসরা’ সহজ পাঠ্য নয়। ইবনুল আরাবির প্রতীকী ভাষা এবং সুফি দর্শনের পরিভাষা বুঝতে তার বৃহত্তর চিন্তার সঙ্গে পরিচয় দরকার। অনেক জায়গা প্রথম পাঠে অস্পষ্ট মনে হতে পারে। কিন্তু এই অস্পষ্টতাকে শুধু দুর্বলতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কিছু বই দ্রুত বোঝার জন্য লেখা হয়। কিছু বই আমাদের ধীর করে দেওয়ার জন্য।
‘কিতাব আল-ইসরা’ দ্বিতীয় ধরনের বই।
এটি পাঠককে উত্তর দেওয়ার চেয়ে প্রশ্নের পাশে বসিয়ে রাখে। ফলে বইটি শেষ করার পরও তার চিন্তা শেষ হয় না। বরং তখনই হয়তো নিজের জীবনের দিকে নতুন করে তাকানোর পালা শুরু হয়। প্রশ্নের পাশে আরো প্রশ্নরা এসে জড়ো হতে থাকে।
‘কিতাব আল-ইসরা’ শেষ পর্যন্ত আকাশে পৌঁছানোর গল্প নয়; এটি মানুষের সীমা এবং সেই সীমা অতিক্রম করার আকাঙ্ক্ষার গল্প। মানুষ জানে সে নশ্বর, তবু অনন্তকে ভাবতে পারে। সে জানে তার জ্ঞান অসম্পূর্ণ, তবু সত্যের সন্ধান ছাড়ে না। সে দূরে যেতে চায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার যাত্রা তাকে নিজের ভিতরেই ফিরিয়ে আনে।
এই অসম্পূর্ণতাই মানুষের সৌন্দর্য। ইবনুল আরাবি সেই সৌন্দর্যকে কোনো চূড়ান্ত সংজ্ঞায় বন্দী করেন না। তিনি শুধু একটি পথের দিকে ইঙ্গিত করেন—যে পথে মানুষ নিজের পরিচিত সীমানা পেরিয়ে অজানার দিকে তাকায়। তারপর ফিরে আসে। একই পৃথিবীতে। কিন্তু অন্য এক চোখ নিয়ে। হয়তো এ কারণেই বইটি পড়া শেষ হওয়ার পরও আকাশের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করে।
কারণ তখন আকাশ আর শুধু দূরের কোনো নীল বিস্তার নয়। তা হয়ে ওঠে মানুষের ভিতরের সেই প্রশ্নের প্রতিচ্ছবি, যার শেষ উত্তর নেই—শুধু আরও গভীরে যাওয়ার আহ্বান আছে। সৃষ্টিকর্তার সাথে মিলিত হওয়ার আকাঙ্খা আছে।

পরিচিতি
মুহিউদ্দিন ইবন আল-আরাবি ছিলেন ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি সাধক, দার্শনিক ও চিন্তাবিদ। তিনি ১১৬৫ সালের ২৭ জুলাই স্পেনের মুরসিয়া শহরে জন্মগ্রহণ করেন। আট বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে সেভিয়ায় চলে যান। সেখানেই তার শৈশব ও যৌবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটে।
তরুণ বয়স থেকেই ইবন আল-আরাবি জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক সাধনার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। তিনি উত্তর আফ্রিকা, মক্কা, দামেস্কসহ মুসলিম বিশ্বের নানা অঞ্চল ভ্রমণ করেন এবং বহু আলেম ও সাধকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তার জীবন ছিল জ্ঞান, ভ্রমণ ও আত্মঅনুসন্ধানের এক দীর্ঘ যাত্রা।
তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-ফুতুহাত আল-মাক্কিয়া’, ‘কিতাব আল-ইসরা’, ‘রুহ আল-কুদস’, ‘মিশকাত আল-আনওয়ার’, ‘ফুসুস আল-হিকাম’ ও ইশারাত ‘আল-কুরআন ফি আলাম আল-ইনসান’। তার লেখায় প্রেম, আত্মা, স্রষ্ট্রা, মানুষ ও অস্তিত্বের সম্পর্ক গভীরভাবে উঠে এসেছে। তার চিন্তা পরবর্তী ইসলামি সুফি দর্শনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
ইবন আল-আরাবি ১২৪০ সালে দামেস্কে মৃত্যুবরণ করেন। আজও তার দর্শন ও রচনা বিশ্বজুড়ে পাঠক ও গবেষকদের ভাবিয়ে তোলে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









