চাল বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য। তাই চালের দাম বাড়া কেবল বাজারের একটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট। অথচ খাদ্য প্রতিমন্ত্রীর আশ্বাসের পরও চালের বাজারে ঊর্ধ্বগতির চিত্র উদ্বেগজনক। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, ধানের দাম বাড়া এবং মৌসুমি প্রভাবকে ব্যবসায়ীরা মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন। কিন্তু এসব কারণের দোহাই দিয়ে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ কতটা যৌক্তিক, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে সরু চালের দাম কেজিপ্রতি ৭৪ থেকে ৭৫ টাকা, মাঝারি চাল ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা এবং মোটা চাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, পাইকারি বাজারেও বিভিন্ন ধরনের চালের দাম বেড়েছে। কুষ্টিয়ার খাজানগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ চাল উৎপাদনকেন্দ্রে প্রশাসনের উদ্যোগে মিলগেট মূল্য কমানোর সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী দুই সপ্তাহ দাম না বাড়ানোর আশ্বাসও বাজার স্থিতিশীল রাখতে পারেনি। বরং কয়েক দিনের ব্যবধানে মিনিকেট চালের মিলগেট মূল্য ৬৮ টাকা থেকে বেড়ে ৭২ টাকায় পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতি প্রমাণ করে, শুধু বৈঠক, নির্দেশনা কিংবা আশ্বাস দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
চালের দাম বৃদ্ধির পেছনে পরিবহন ব্যয় ও ধানের মূল্যবৃদ্ধির ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় এক ট্রাক চাল পরিবহনের ভাড়া ২০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২৪ হাজার টাকা হয়েছে বলে জানিয়েছেন একজন পাইকারি ব্যবসায়ী। আবার বিভিন্ন অঞ্চলে ধানের দামও বেড়েছে। উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহনের ব্যয় বাড়লে চালের বাজারদরে তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। তবে, প্রকৃত ব্যয় যতটা বেড়েছে, খুচরা পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির পরিমাণ তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা, সেটি যাচাই করতে হবে। কোনো যৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধিকে অজুহাত করে অতিরিক্ত মুনাফা করার সুযোগ দেওয়া যায় না।
বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সরকারি পরিসংখ্যানের অসামঞ্জস্যও উদ্বেগজনক। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুসারে, গত এক সপ্তাহে চালের দাম বাড়েনি; বরং সরু চালের দাম কিছুটা কমেছে। অথচ বাজার ঘুরে পাওয়া চিত্রে দাম বৃদ্ধির তথ্য উঠে এসেছে। এই ব্যবধানের কারণ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি, বাজারের নমুনা, চালের মান ও অঞ্চলভেদে দামের পার্থক্য এর পেছনে থাকতে পারে। তাই বাজারের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি পাইকারি ও খুচরা দরের সমন্বিত হিসাব প্রকাশ করা জরুরি।
চালের পাশাপাশি সবজি, ডিম ও মাছের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়িয়েছে। অধিকাংশ সবজি কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ১২০ টাকা, ডিমের ডজন ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা এবং গরুর মাংস ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাব নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ে। আয় না বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে পরিবারের খাদ্যতালিকা সংকুচিত হয়, পুষ্টির ঘাটতি বাড়ে এবং সঞ্চয়ের সুযোগ কমে যায়। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির মধ্যে এ পরিস্থিতি দারিদ্র্য আরো গভীর করতে পারে।
এ অবস্থায় সরকারের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত বাজার তদারকি জোরদার করা। উৎপাদনকেন্দ্র থেকে শুরু করে মিলগেট, পাইকারি আড়ত ও খুচরা দোকান পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে মূল্য পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, মজুতদারি কিংবা কারসাজির প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে, ব্যবসায়ীদের নির্বিচারে দায়ী না করে উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহ ও প্রকৃত মুনাফার তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের পরিবর্তনের প্রভাবও নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সরবরাহ বাড়ানো এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ধান-চাল সংগ্রহের কার্যকর পরিকল্পনা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি মজুত ব্যবস্থাপনা এবং বাজারে পর্যাপ্ত চালের সরবরাহ মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ন্যায্যমূল্যে চাল বিক্রি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়াতে হবে।
চালের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য এখন প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ ও জবাবদিহি। মন্ত্রীর আশ্বাস তখনই অর্থবহ হবে, যখন বাজারে তার ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাবে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিত্যপণ্যের দাম রাখা শুধু অর্থনৈতিক দায়িত্ব নয়, সামাজিক ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন। তাই আশ্বাসের সীমা পেরিয়ে সরকারকে কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছ তথ্য এবং সময়োপযোগী নীতির মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে- ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









