নাগরিককে সেবা না দিয়ে বিল আদায় কোনোভাবেই একটি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্য নীতি হতে পারে না। অথচ রাজধানী ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় কার্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকলেও ঢাকা ওয়াসার পানির বিলের সঙ্গে নিয়মিত আদায় করা হচ্ছে সুয়ারেজ বিল। অর্থাৎ, যে সেবা অনেক ক্ষেত্রেই নেই, সেই সেবার জন্যও গ্রাহকদের অর্থ দিতে হচ্ছে। নাগরিকদের অভিযোগ, এভাবে বিল আদায় অন্যায্য এবং জবাবদিহিহীনতারই বহিঃপ্রকাশ। তাই সুয়ারেজ লাইনবিহীন এলাকায় এক বছরের জন্য বিল আদায় বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাতে হয়। তবে, এই সিদ্ধান্ত যেন সাময়িক আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং সেবার সঙ্গে বিলের সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা এবং রাজধানীর পয়ঃনিষ্কাশন সংকট সমাধানের কার্যকর উদ্যোগে পরিণত হয়।
ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুসারে, সংস্থাটির ১০টি পরিচালন অঞ্চলের মধ্যে মাত্র দুটি অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ সুয়ারেজ ব্যবস্থা রয়েছে। চারটি অঞ্চলে আংশিক ব্যবস্থা থাকলেও বাকি চারটিতে কোনো সুয়ারেজ লাইন নেই। গুলশান, বনানী, বারিধারা, নিকেতন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও নিকুঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকাতেও ওয়াসার সুয়ারেজ নেটওয়ার্ক নেই। অথচ পানি সরবরাহের সংযোগ থাকা গ্রাহকদের কাছ থেকে পয়ঃনিষ্কাশন বিল আদায় করা হচ্ছে। রাজধানীতে পানির সরবরাহ লাইন তিন হাজার পাঁচশ কিলোমিটারের বেশি হলেও সুয়ারেজ লাইন মাত্র ৯৩০ কিলোমিটার। এই পরিসংখ্যানই সেবার বিস্তার ও বিল আদায়ের বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের অসংগতির ইঙ্গিত দেয়।
গত ১০ সেপ্টেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সুয়ারেজ লাইনবিহীন এলাকায় আগামী এক বছর বিল আদায় না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি সময়োপযোগী উদ্যোগ হলেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। কোন কোন এলাকা এ সিদ্ধান্তের আওতায় আসবে, কবে থেকে তা কার্যকর হবে এবং সংশ্লিষ্ট গ্রাহকেরা কীভাবে বিল থেকে অব্যাহতি পাবেন- এসব বিষয়ে দ্রুত সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় কাগজে-কলমে সুয়ারেজ লাইন থাকলেও তা অকার্যকর, সেসব এলাকার বাস্তব পরিস্থিতিও যাচাই করতে হবে। শুধু অবকাঠামোর অস্তিত্ব নয়, সেবার কার্যকারিতাকেও বিল আদায়ের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
সুয়ারেজ বিলের প্রশ্নটি কেবল নাগরিকের পকেট থেকে অর্থ নেওয়ার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর মাত্র ২০ শতাংশ এলাকায় কোনো না কোনো ধরনের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা রয়েছে। বাকি বড় অংশে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় বিপুল পরিমাণ পয়ঃবর্জ্য খাল, নদী ও জলাশয়ে মিশছে। এর ফলে পানি ও পরিবেশদূষণ বাড়ছে, হুমকির মুখে পড়ছে নগরবাসীর স্বাস্থ্য। গুলশান-বনানী লেকের দূষণ এই সংকটেরই একটি দৃষ্টান্ত। অথচ ২০১৩ সালে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হলেও এক যুগেও তার প্রত্যাশিত বাস্তবায়ন হয়নি। দাশেরকান্দি শোধনাগার নির্মিত হলেও প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্ক পাইপলাইন গড়ে ওঠেনি; অন্য শোধনাগারগুলোর বাস্তবায়নেও অগ্রগতি সীমিত।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ঢাকা ওয়াসাকে বিল আদায়ের হিসাবের পাশাপাশি সেবার মান ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির হিসাবও জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। কোন এলাকায় কত গ্রাহকের কাছ থেকে সুয়ারেজ বিল আদায় হচ্ছে, কতজন প্রকৃত সেবা পাচ্ছেন এবং কোথায় কী উন্নয়নকাজ প্রয়োজন- এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত।
পাশাপাশি পয়ঃনিষ্কাশন লাইন সম্প্রসারণ, পুরনো লাইন সংস্কার এবং বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণে সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাজউক, সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট আবাসিক সমিতির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সেপটিক ট্যাংক বা পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার স্থাপনের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষেত্রেও ভবনের নকশা, জায়গার সংকট ও কারিগরি বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাফল্য কেবল রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং নাগরিকেরা কতটা কার্যকর সেবা পাচ্ছেন, সেটিই তার প্রধান মাপকাঠি। সেবা না দিয়ে বিল আদায়ের অভিযোগের অবসান ঘটাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে অতীতে সেবা না পেয়েও যাঁরা বিল দিয়েছেন, তাঁদের অভিযোগ পর্যালোচনা করে প্রতিকারের উপায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এক বছরের সাময়িক অব্যাহতি যেন সমস্যাকে আড়াল করার সুযোগ না হয়। বরং এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে ঢাকা ওয়াসার সেবাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের সূচনা হোক। নাগরিকেরা বিল দিতে আপত্তি করেন না; তাঁদের ন্যায্য দাবি হলো, যে সেবার জন্য অর্থ দেওয়া হচ্ছে, সেই সেবা বাস্তবেও নিশ্চিত করতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









