বিশ্বের প্রতিটি দেশেই সরকার ও সরকারি কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করার অধিকার জনগণ রাখে। বিশ্বের একমাত্র ব্যাতিক্রম দেশ হলো সৌদি, যেখানে গণতন্ত্র তথা মানবাধিকার সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। সৌদি নাগরকদের জন্য সৌদি আরবের সরকার বা রাজপরিবারের সমালোচনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। গণমাধ্যম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং ভিন্নমত পোষণকারী, সাংবাদিক বা সমাজকর্মীদের প্রায়ই কারাদণ্ড বা কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়।
সৌদি আরব একটি পরম রাজতন্ত্র দ্বারা শাসিত। এখানে কোনো নির্বাচিত সংসদ বা রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ নেই। সকল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজপরিবারের হাতে থাকে। কতৃত্ববাদী, স্বৈরাচারী, একনায়কতান্ত্রিক, মানবিক বিচারহীন রাষ্ট্রের উদাহরণ হিসাবে রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিষয় অধ্যয়নে সংযুক্ত করা দরকার। কারণ, কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক সরকার হলো এমন শাসনব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে এবং জনগণের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও মতামত প্রকাশের অধিকার মারাত্মকভাবে খর্ব করা হয়।
সাধারণ অর্থে এই দুটি ধারণাকে একই মনে হলেও এদের মধ্যে সূক্ষ্ম কিছু তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক পার্থক্য রয়েছে। জনগণের মৌলিক অধিকার এবং রাজনৈতিক অধিকার চরমভাবে সীমিত করা হয়। কর্তৃত্ববাদ বা অথরিটারিয়ানিজম হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ক্ষমতা একক ব্যক্তি বা একটি নির্দিষ্ট ছোট গোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল বা সামরিক জান্তার হাতে থাকে। এটি স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে কিছুটা বিস্তৃত রূপ হতে পারে। আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং সংবাদমাধ্যমকে সরকারের অধীনে বা নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। আর এই দুইটি বিষয়ই সৌদি শাসন ব্যবস্থায় বিদ্যমান।
সম্প্রতি দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে সৌদি আরবে। তাদের একজন নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির তাকে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট তথ্যপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত (সাইবার) অপরাধের অভিযোগে আটক করা হয়। তিনি জেদ্দার একটি সংশোধনাগারে বন্দি ছিলেন।
অন্য জন সুইটি আক্তার, তাকে ২০২৩ সালের ২ আগস্ট ব্যভিচারের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। তিনি জেদ্দার নারী কারাগারে বন্দি ছিলেন। সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির তথ্য অনুসারে, ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে তা’জির হিসেবে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে সৌদির কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের একটি তালিকা দিলেও তাতে মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি উল্লেখ করেনি। দণ্ড কার্যকরের পর গণমাধ্যমের খবরে বিষয়টি জানতে পারে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট। এই বিচার কখন কীভাবে হলো তা দণ্ডিত ব্যাক্তিদের স্বজনরা জানে না। নজরুল ইসলাম আবদুল বশিরের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং সুইটি আক্তারের বাড়ি টাঙ্গাইল।
সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসে কর্মরতদের বিচার অনুষ্ঠানে ডাকা হয়নি। কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছিল যে তারা নবদম্পতি এবং হানিমুনে গিয়ে মসজিদের ভেতর কপালে চুমু দেওয়ার অপরাধে তাদের শাস্তি হয়েছে। তবে, নজরুলের পরিবার ও প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে জানা যায়, তারা দম্পতি ছিলেন না, একে অপরকে চিনতেনও না এবং তাদের বিরুদ্ধে ভিন্ন গুরুতর নৈতিক অপরাধ ও সাইবার অপরাধের অভিযোগ ছিল। কিন্তু কি বা কোন ধরনের নৈতিক অপরাধ বা সাইবার অপরাধ তার বিশদ বিবরণ গণমাধ্যমে আসেনি। সৌদি আরবে ব্যভিচার বা ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ককে (জিনা) একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। বিবাহিত ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড (রজম) দেওয়ার বিধান রয়েছে।
অবিবাহিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাধারণত ১০০ দোররা বা বেত্রাঘাতের বিধান রয়েছে। তবে, আদালতের বিচারিক ক্ষমতা (তাজির) ও অপরাধের ধরনের ওপর ভিত্তি করে কারাদণ্ড, জরিমানা বা অন্যান্য শাস্তির প্রয়োগও ঘটে। এখানে একটা ফাকও রয়েছে, যেমন- শরিয়া আইন অনুযায়ী ব্যভিচার প্রমাণ করতে হয় চারজন প্রত্যক্ষদর্শী অথবা চারবার নিজের স্বীকারোক্তির মাধ্যমে। অর্থ্যাৎ দোষী ব্যক্তি যদি চারবার স্বীকার করেন তিনি দোষ করেছেন তাহলে তা সত্য হিসাবে প্রমাণিত হবে। এই ফাঁকটা বলছি, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর উন্নয়শীল দেশের নারীরা সৌদি আরবে যান গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে। তারা প্রতিনিয়ত সেখানে যৌন হয়রানীর শিকার হচ্ছেন। শোনা যায়, একবার গৃহকর্তার হাতে, আরেকবার গৃহকর্তার ছেলের হাতেও একই নারীকর্মী ধর্ষিত হন। কিন্তু সে বিচার চাইতে পারে না বা বিচার পায় না।
তার কারণ হলো, সৌদি আইনানুসারে কোনো নারী একা একা অর্থাৎ উপযুক্ত পুরুষ অভিভাবক ছাড়া রাস্তায় বেরুতে পারবেন না। তাই ধর্ষিতা নারী একা বের হয়ে আইনের আশ্রয় নিতে পারেন না। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, চারজন সাক্ষী বা দোষীর চারবার স্বিকারোক্তির অভাব। কোনো ধর্ষক চারজন স্বাক্ষী রেখে কখনো ধর্ষণ করে কি? তাছাড়া ধর্ষক কি কখনো স্বীকার করবে সে ধর্ষণ করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীদের গাড়ি চালানো বা একা ভ্রমণের অনুমতি দেওয়ার মতো কিছু সংস্কার করা হলেও, 'অভিভাবকত্ব ব্যবস্থা' বিলুপ্ত হয়নি। ফলে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য এখনও পুরুষ অভিভাবকের অনুমতির প্রয়োজন হয়।
সৌদি আরব থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশি নারী কর্মীদের মধ্যে ৯০ থেকে ৯৪ শতাংশ নারী কর্মী শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। তাছাড়া সৌদি সমাজে পারিবারিক বা গার্হস্থ্য সহিংসতার হার নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্থানীয় বিভিন্ন গবেষণায় প্রায় ৫৭ দশমিক ৮ থেকে ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত সহিংসতার তথ্য পাওয়া গেছে। গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এই নয় মাসে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন ১ হাজার ৬৮৭ জন বাংলাদেশী নারীকর্মী।
তাঁদের মধ্যে ৯৭৯ জনই সৌদি আরব থেকে, যা মোট ফেরত আসা কর্মীর ৫৮ দশমিক ৬২ শতাংশ। নারীকর্মীরা ফেরত আসার মূল কারণ হলো, নির্যাতন, বৈষম্য ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশ। আরব অঞ্চলের বৈবাহিক বিশ্বস্ততা নিয়ে করা ২০২৫ সালের একটি বেসরকারি বৈশ্বিক সমীক্ষায় ধারণা করা হয়েছে, সৌদি আরবে বিবাহিত ব্যক্তিদের মধ্যে পরকীয়া বা অনৈতিক সম্পর্কের আনুমানিক হার প্রায় ১৭ শতাংশ।
তবে, প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যের অভাবে এই ধরনের জরিপের শতভাগ সত্যতা নিশ্চিত করা কঠিন। সৌদি আরবে ব্যভিচার বা পরকীয়ার সুনির্দিষ্ট হারের কোনো অফিশিয়াল বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান নেই। দেশটির কঠোর আইনি ব্যবস্থা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার কারণে এই ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ের কোনো পাবলিক ডেটা বা সরকারি ট্র্যাকিং রেকর্ড পাওয়া যায় না। সৌদি আরবে বিবাহবিচ্ছেদের হার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। চলতি বছরে প্রায় ৫৭ হাজার ৫৯৫টি বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, প্রতিদিন গড়ে ১৫৭টি এবং প্রতি নয় মিনিটে একটি বিবাহবিচ্ছেদ হচ্ছে। দেশটির আইন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা যায়। ( সূত্র: এনটিভি)
সৌদি আরবে বিয়ে বা তালাক কার্যকর করতে এখনো পুরুষ অভিভাবকের (ওয়ালি) সম্মতি বা আনুষ্ঠানিকতা প্রয়োজন হয়। নারী তা পারবে না। বিবাহবিচ্ছেদের পর সন্তানদের আইনি অভিভাবকত্ব বা সন্তান সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মায়ের একক অধিকার থাকে না, যা সাধারণত পিতার কাছে থাকে। সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার আইনসহ কিছু বিষয়ে এখনো পুরুষদের তুলনায় নারীরা সমতা পায় না।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, পুরুষ অভিভাবকত্ব ব্যবস্থার কিছু অবশিষ্ট প্রভাব এখনো সৌদি সমাজে বিদ্যমান। তাছাড়া, কাফালা' বা কফিল ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিক স্পন্সর বা মালিকের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে কম বেতন, অতিরিক্ত খাটুনি, পাসপোর্ট আটকে রাখা এবং শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের মতো শোষণের শিকার হতে হয়। সৌদি কফিলরা শ্রমিকদেরকে দাসপ্রথা বা দাস আমলের চাইতে বেশি নির্যাতন করে। সৌদি আরবের বিদ্যমান শাসন কাঠামো চরম স্বৈরতান্ত্রিক, অমানবিক, বিচারহীন সংস্কৃতির পরিচয় বহন করছে।
লেখক : কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









