রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতি দিতে হয় মাইক্রোফোনের সামনে, আর তার মূল্য দিতে হয় বাস্তব জীবনে। নির্বাচনের আগে কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতির অবসান, মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রতিশ্রুতিতে জনপদ মুখর হয়। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদল কিংবা নির্বাচনী উত্তাপ শেষ হলে প্রশ্ন ওঠে, যে অঙ্গীকারে মানুষের ভোট চাওয়া হয়েছিল, তার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে? প্রতিশ্রুতি যদি ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হয়, তবে ক্ষমতায় গিয়ে তার হিসাব দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকবে না কেন? রাজনীতির সংকট প্রতিশ্রুতির অভাবে নয়; সংকট প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যকার ক্রমবর্ধমান দূরত্বে। ঘোষণা যত বড় হয়, মানুষের প্রত্যাশার পারদও তত উঁচু হয়।
অথচ, প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা, অর্থায়ন, দক্ষ প্রশাসন ও সময়সীমার হিসাব অনেক সময় ঘোষণার আড়ালে চাপা পড়ে যায়। তখন রাজনীতি জনসমস্যার সমাধান না হয়ে আশ্বাস উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়। বাস্তবতা অবশ্য বক্তৃতার ভাষা মানে না। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে সাধারণ পরিবারের বাজেট ভেঙে পড়ে; শিক্ষিত তরুণ কাজ না পেলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান তার অনিশ্চয়তা দূর করে না; চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পরিবার নিঃস্ব হলে স্বাস্থ্যসেবার সাফল্যের প্রচার তার কষ্ট লাঘব করে না। নাগরিকের কাছে উন্নয়ন কোনো বিমূর্ত শব্দ নয়।
তার কাছে উন্নয়ন মানে আয় দিয়ে সংসার চালাতে পারা, যোগ্যতা অনুসারে কাজ পাওয়া, প্রয়োজনের সময় চিকিৎসা পাওয়া এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কমা। এখানেই রাজনৈতিক প্রচার ও জনজীবনের বাস্তবতার সংঘাত। কোনো প্রকল্প উদ্বোধন করা সাফল্যের সূচনা হতে পারে, কিন্তু সেটি শেষ পর্যন্ত মানুষের কতটা উপকারে এলো, তার প্রমাণ নয়। বাজেট বরাদ্দ কিংবা অর্থ ব্যয়ের পরিমাণও একা সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। দেখতে হবে, নির্ধারিত অর্থে প্রত্যাশিত সেবা মিলেছে কিনা, প্রকল্পের সুফল কারা পেয়েছে এবং অপচয় বা অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তার নিষ্পত্তি হয়েছে কিনা। সব ব্যর্থতার পেছনে অবশ্য রাজনৈতিক অসততা থাকে না। অর্থনৈতিক সংকট, দুর্যোগ কিংবা প্রশাসনিক জটিলতায় পরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারে। কিন্তু দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয় সংকটমুক্ত পরিস্থিতিতে শুধু সাফল্য ঘোষণা করা নয়; প্রতিকূলতায় ব্যর্থতার কারণ প্রকাশ করা এবং সংশোধনের পথ দেখানোও।
কোনো অঙ্গীকার পূরণ করা সম্ভব না হলে তা স্বীকার করে নতুন সময়সীমা ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা জানানো উচিত। অজুহাত দিয়ে দায় এড়ানো আর জবাবদিহির মাধ্যমে সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করা এক বিষয় নয়। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তখনই প্রকাশ পায়, যখন তা যাচাইয়ের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা থাকে না। নির্বাচনী ইশতেহারে কী বলা হয়েছিল, কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, কোন উদ্যোগ পিছিয়ে আছে এবং কেন এসব তথ্য নাগরিকের সামনে নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, সম্ভাব্য ব্যয় ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য যুক্ত থাকা উচিত। প্রকল্পের অগ্রগতি ও ব্যয়ের পাশাপাশি তার বাস্তব ফলাফলও স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
এ দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। বিরোধী দলকে তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন তুলতে হবে, গণমাধ্যমকে ঘোষণার পুনরাবৃত্তি না করে বাস্তবায়নের অনুসন্ধান করতে হবে, আর নাগরিক সমাজকে জনস্বার্থের বিষয়গুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও নির্বাচনী অঙ্গীকারের অগ্রগতি নিয়ে প্রকাশ্য প্রতিবেদন দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। এতে শুধু ব্যর্থতা চিহ্নিত হবে না; কার্যকর উদ্যোগের স্বীকৃতি এবং নীতিগত ভুল সংশোধনের সুযোগও তৈরি হবে। নাগরিকদের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। স্লোগানের আকর্ষণে মুগ্ধ হয়ে প্রশ্নহীন সমর্থন দিলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে জবাবদিহির চাপ দুর্বল হয়ে পড়ে।
ভোটের আগে কে কত আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি দিল, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দিল, অতীতের কাজের হিসাব দেখাল এবং ব্যর্থতার দায় স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকল। গণতন্ত্রে ভোট শুধু প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যম নয়; জনস্বার্থে দেওয়া অঙ্গীকারের হিসাব চাওয়ারও শক্তি। একটি রাষ্ট্রে সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সব সময় সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু প্রতিশ্রুতির হিসাব গোপন রাখা, ব্যর্থতা আড়াল করা এবং একই অঙ্গীকার বারবার নতুন মোড়কে হাজির করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি হতে পারে না। জনগণের আস্থা একবার ক্ষয়ে গেলে তা ফিরিয়ে আনতে বক্তৃতার চেয়ে অনেক বেশি কাজ প্রয়োজন।
রাজনীতির দেউলিয়াপনা শুধু অর্থের অপচয়ে নয়; মানুষের আস্থা হারানোর মধ্যেও প্রকাশ পায়। যে নেতৃত্ব প্রতিশ্রুতিকে দায়িত্ব হিসেবে নেয়, সে নেতৃত্ব ব্যর্থতার হিসাব দিতেও ভয় পায় না। আর যে নেতৃত্ব প্রতিশ্রুতিকে কেবল ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার বানায়, তার কাছে জনগণের প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত প্রচারণার উপকরণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া রাজনৈতিক অধিকার; প্রতিশ্রুতির হিসাব দেওয়া রাজনৈতিক দায়িত্ব। জনগণকে আশ্বাসের মোহে আটকে রাখা নয়, বাস্তব ফলাফলের মাধ্যমে আস্থা অর্জনই হওয়া উচিত রাজনীতির চূড়ান্ত পরীক্ষা।
লেখক : শিক্ষার্থী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









