মানুষের মৌলিক সমস্যাবলী বিশ্বের উন্নত, অনুন্নত, উন্নয়নশীল দেশে প্রায় একই রকম। মৌলিক অধিকার বা চাহিদা পূরণে যখন ঘাটতি দেখা দেয় বা সেইসব সমস্যা যখন সমাধানের পথ রুদ্ধ হয়ে আসে বা স্বাভাবিকভাবে মৌলিক চাহিদা পূরণ বা প্রাপ্তিতে টান পড়ে তখন ক্ষোভ, অসন্তোষ ক্রমশ দানা বাঁধে, ধীরে ধীরে তা আন্দোলনে রূপ নেয়। ইউরোপ জুড়ে এখন মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে টান পড়ছে বলেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে।
তন্মধ্যে রয়েছে- শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা, আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া, মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক দুর্নীতির অভিযোগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, আলজেরিয়া, বেলজিয়াম, আলবেনিয়াসহ অন্তত নয়টি দেশে তরুণদের নেতৃত্বে এই আন্দোলন চলছে। কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল, কোথাও ধর্মঘট, আবার কোথাও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, দোকানপাট ভাঙচুর, রাস্তায় যানচালাচল বন্ধ করে অবরোধ চলছে। ইউরোপজুড়ে এই অসন্তোষ নতুন করে সামনে এনেছে একটি প্রশ্ন- মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ২০১১ সালের ‘আরব বসন্তের’ মতো কোনো পরিস্থিতির দিকে কি এগোচ্ছে ইউরোপ?
বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন দেশের আন্দোলনের মধ্যে কিছু মিল থাকলেও সব বিক্ষোভকে একই আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। দেশভেদে দাবির পার্থক্য রয়েছে। তবে শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে তরুণদের উদ্বেগ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অসন্তোষের একটি সাধারণ ভিত্তি তৈরি করেছে। ইউরোপের চলমান অস্থিরতার অন্যতম কেন্দ্র ফ্রান্স। গত ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবরের সপ্তাহান্তে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়। ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ১৭ অক্টোবর দেশজুড়ে ১১০টি বিক্ষোভে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন।
আন্দোলনের আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল আট লাখ। এ পর্যন্ত প্রায় ১৫০০ জনকে গ্রেফতার করা হয় বলে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু শহরে রাত্রিকালীন কারফিউ চলছে। আন্দোলনের সূত্রপাত গত ২১ সেপ্টেম্বর। ক্রেতেই শহরের লিসে সাঁ-একজুপেরি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ ভবন ও শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেন। পরে তা অন্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হন ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য এবং মূল্যস্ফীতিতে চাপে থাকা সাধারণ মানুষ। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। তবে, আন্দোলনের বিস্তার দেশটির শিক্ষা ও অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে জনঅসন্তোষের ব্যাপকতাও সামনে এনেছে।
ইতালিতে ১৬ অক্টোবর শিক্ষা খাতে অর্থায়ন, সামরিক ব্যয় এবং সরকারি নীতির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা রোম ও তুরিনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখলও করেন তাঁরা। ‘নো মেলোনি ডে’ নামে পরিচিত বিক্ষোভে বিদেশি শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ভর্তির ওপর প্রস্তাবিত সীমার বিরোধিতা করা হয়। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানান শিক্ষার্থীরা। দেশটির সরকারের একটি জাতীয় ডিক্রিতে কিছু শ্রেণিকক্ষে অইতালীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ শতাংশে সীমিত রাখার বিধান রয়েছে। বেলজিয়ামেও শিক্ষা খাতে ব্যয় সংকোচন, ফি বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। লিয়েজ শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের তরুণদের ক্ষোভের বড় কারণ হয়ে উঠেছে আবাসনসংকট। স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী বাসস্থানের অভাব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় মানুষের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। স্পেনে আবাসনের অধিকার নিয়ে আন্দোলন জোরালো হয়েছে। মাদ্রিদে আন্দোলনকারীরা আবাসিক সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ তহবিলগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানিয়েছেন। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনেও ১৭ অক্টোবর বাড়িভাড়া, মজুরি, পেনশন ও জনসেবার মান নিয়ে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে ইউরোপে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ অতিরিক্ত মানুষের সঙ্গে গাদাগাদি করে বসবাস করতেন। এ চিত্র তরুণদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসন নিশ্চিত করার কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরে। চাকরি পেলেও বাড়িভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক তরুণের পক্ষে স্বাধীনভাবে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে, শিক্ষা শেষ করে ভালো চাকরি, আর্থিক নিরাপত্তা ও উন্নত জীবন গড়ার প্রত্যাশা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
আলবেনিয়ায় আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ, বেকারত্ব ও সরকারের প্রতি দীর্ঘদিনের অসন্তোষ। গত ১৭ অক্টোবর রাজধানী তিরানায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরে হাজারো তরুণ বিক্ষোভ করেন। প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের দাবিতে এটি ছিল টানা পঞ্চম দিনের ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, বিক্ষোভের সময় মুখোশধারী কয়েকজন পুলিশের দিকে পাথর ছুড়ে মারেন। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, স্টান গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। তবে, পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী রামা। তাঁর অভিযোগ, বিরোধীরা অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। অনুরূপভাবে জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও গ্রিসেও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট, আবাসন ব্যয় ও সামরিক নীতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ চলছে।
২০১০ সালের শেষ দিকে তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া আরব বসন্ত মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। দুর্নীতি, অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ ওই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি ছিল। এর ধারাবাহিকতায় কয়েকটি দেশে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শাসকের পতন ঘটে।
ইউরোপের বর্তমান বিক্ষোভের সঙ্গেও তরুণদের ক্ষোভ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত হওয়ার প্রবণতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থার মিল রয়েছে। তবে, মৌলিক পার্থক্যও আছে। ইউরোপের অধিকাংশ দেশে নির্বাচনী রাজনীতি, বিরোধী দল, আদালত ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে। তাই বর্তমান আন্দোলনের বড় অংশের দাবি রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে সংস্কার, জবাবদিহি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক টিইউআই ফাউন্ডেশনের ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এক গবেষণায় ইউরোপের সাতটি দেশের ৮ হাজার ২৪ জন তরুণের মতামত নেওয়া হয়। এতে ৫২ শতাংশ অংশগ্রহণকারী আশঙ্কা প্রকাশ করেন, তাঁদের প্রজন্মের জীবনযাত্রার মান বাবা-মায়ের প্রজন্মের চেয়ে খারাপ হবে। বিপরীতে, মাত্র ২৫ শতাংশ মনে করেন, তাঁরা আগের প্রজন্মের তুলনায় ভালো জীবন পাবেন।
এমনি টালমাটাল অবস্থায় ইউরোপের বর্তমান বিক্ষোভ আরব বসন্তের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে কিনা, তা নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই। তবে, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা যে রাজনৈতিক অসন্তোষকে তীব্র করছে, তা স্পষ্ট। সরকারগুলোর সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ- একদিকে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে বিক্ষোভের পেছনে থাকা বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান করা। শিক্ষা ও আবাসনে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, দুর্নীতির জবাবদিহি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে এই অসন্তোষ আরো বিস্তৃত হতে পারে।
ইউরোপের তরুণেরা কেবল প্রতিবাদ করছেন না; তাঁরা তাঁদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে নিশ্চয়তা চাইছেন। এসব দাবি বাস্তবায়নে সরকারগুলো কতটা নিশ্চয়তা দিতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে চলমান আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথ। প্রত্যাশা থাকবে, মানুষের এসব মৌলিক সমস্যা দ্রুতই সমাধানে উদ্যোগী হবে চলমান আন্দোলনরত ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশসমূহের সরকার ও প্রশাসন। নতুবা এসব দেশের শান্তি, নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরো বিপজ্জনক পথে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ ও শঙ্কা থেকেই যাবে। আর, তখন ঐ পরিস্থিতি যে ‘আরব বসন্তের’ পথে ধাবিত হবে না, তা নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব।
লেখক : কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









