ভোজ্যতেল মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য পণ্য। ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম- সব শ্রেণি ও পেশার মানুষকে প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে ভোজ্যতেলের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে, এই পণ্যের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে প্রতিটি পরিবারের খাদ্যব্যয়ে। এমন বাস্তবতায় দেশের ভোজ্যতেল উৎপাদন ও পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে প্রতি লিটারে আরো ১৪ টাকা দাম বাড়ানোর আবেদন জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। একদিকে কোম্পানিগুলোর মূল্যবৃদ্ধির দাবি, অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে আপাতত দাম না বাড়ানোর ঘোষণা- এই দুই অবস্থানের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, বর্তমানে বোতলজাত সয়াবিন তেলের প্রতি লিটারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ২০৪ টাকা। উৎপাদন ও পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো তা বাড়িয়ে ২১৮ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৭০ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা করার আবেদনও জানানো হয়েছে। সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। এর অল্প সময়ের ব্যবধানে আবারও মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব স্বাভাবিকভাবেই ভোক্তাদের জন্য বাড়তি চাপের আশঙ্কা তৈরি করছে।
কোম্পানিগুলোর বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন কাঁচামালের দাম ১ হাজার ৩০০ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩২৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান ব্যয় বিবেচনায় প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রায় ২৩৩ টাকা হওয়া উচিত বলেও তারা উল্লেখ করেছেন। ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি পেলে তার প্রতিফলন পণ্যের দামে পড়তে পারে- এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোম্পানিগুলোর প্রকৃত উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় কতটা বেড়েছে, তাদের মুনাফার হার কত এবং প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা কতটুকু?
স্বস্তির বিষয় হলো, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। তাঁর বক্তব্য অনুসারে, আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে ভোজ্যতেল, ছোলা, ডাল ও চিনিসহ আমদানিনির্ভর পণ্যের সরবরাহ ও সম্ভাব্য চাহিদা পর্যালোচনা করা হয়েছে। সরকারের দাবি, প্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ পাইপলাইনে রয়েছে এবং রমজানের আগে-পরে বাজারে ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই। এই অবস্থান ধরে রাখা জরুরি। কারণ, বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর সুযোগ কমে আসে।
তবে, শুধু দাম না বাড়ানোর ঘোষণা দিলেই সরকারের দায়িত্ব শেষ হবে না। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, অবৈধ মজুতদারি ও কারসাজি প্রতিরোধ, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো এবং নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে, রমজান সামনে রেখে ভোজ্যতেলের চাহিদা বাড়তে পারে। এ সময় সরবরাহব্যবস্থায় কোনো ধরনের বিঘ্ন যাতে না ঘটে, সে জন্য আমদানি ও মজুদ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারে কোনো ঘাটতি দেখা দিলে তার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভোজ্যতেল কোম্পানিগুলো সতর্ক করেছে, দ্রুত মূল্য সমন্বয় না হলে সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে এবং রমজানে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এই আশঙ্কা একেবারে উপেক্ষা করা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি মূল্যবৃদ্ধির চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেও বিষয়টিকে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। সরবরাহে সংকটের আশঙ্কা থাকলে কোম্পানিগুলোকে তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে হবে। সরকারকেও যাচাই করতে হবে, প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধি ছাড়া সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার অন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে কিনা।
সয়াবিন তেলের দাম নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত হবে, যাচাই-বাছাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির বোঝা না চাপানো। একই সঙ্গে উৎপাদকদের ব্যয়সংক্রান্ত দাবির নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করে একটি স্বচ্ছ ও যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে ভোজ্যতেলের আমদানির উৎস বহুমুখী করা, সরবরাহব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা বাড়ানো, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং অযৌক্তিক মুনাফা ও কারসাজি প্রতিরোধের উদ্যোগও প্রয়োজন।
সয়াবিন তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রশ্নে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদকদের যৌক্তিক স্বার্থ এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। ব্যবসায়ীদের ব্যয় ও সরবরাহের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে, কিন্তু সেই অজুহাতে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা যাবে না। রমজানের আগে বাজার স্থিতিশীল রাখা, পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখাই হওয়া উচিত সরকারের অগ্রাধিকার। কারণ, বাজারে স্থিতিশীলতা শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থের বিষয় নয়; এটি জনস্বস্তি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সরকারের প্রতি মানুষের আস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









