গণিত আমাদের চারপাশে আছে। আমরা তাকে সব সময় দেখতে পাই না, কিন্তু সে আমাদের সঙ্গে থাকে—আকাশের রঙে, গাছের পাতার বিন্যাসে, মানুষের মস্তিষ্কের ভাঁজে, সমুদ্রের ঢেউয়ে, দূরের নক্ষত্রের চলনে। পৃথিবীকে আমরা যত গভীরভাবে দেখতে শুরু করি, ততই বুঝতে পারি, তার ভেতরে কোথাও এক অদৃশ্য গণিত কাজ করে চলেছে।
সূর্যাস্তের সময় আকাশ কেন লাল হয়ে ওঠে, বিমানের ডানা কীভাবে বাতাসকে কেটে এগিয়ে যায়, রোলার কোস্টারের বাঁক কীভাবে তৈরি হয়, অর্থনীতি কীভাবে ওঠানামা করে—এসব প্রশ্নের পেছনেও গণিত আছে। এমনকি আমাদের শরীর, কোষ, মস্তিষ্ক এবং জীবনের নানা জটিল ঘটনাও কোনো না কোনোভাবে সংখ্যার সঙ্গে যুক্ত।
তাই গণিত শুধু হিসেবের বিষয় নয়। এটি পৃথিবীকে দেখার একটি পদ্ধতি। কখনো একটি সংখ্যা, কখনো একটি রেখা, কখনো একটি অদৃশ্য আকৃতি আমাদের এমন কিছু দেখতে সাহায্য করে, যা খালি চোখে দেখা যায় না।
মানুষ যখন মহাকাশের দিকে তাকায়, তখনও গণিত তার সঙ্গে থাকে। মহাকাশযানকে কোথায় পাঠাতে হবে, কোনো গ্রহের কক্ষপথ কীভাবে নির্ণয় করতে হবে, মহাবিশ্বের আকৃতি কেমন হতে পারে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গণিত দরকার। একদিন যদি দূর কোনো গ্রহের প্রাণীর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়, সেখানেও হয়তো প্রথম ভাষা হবে গণিত। কারণ ভাষা আলাদা হতে পারে, কিন্তু একটি সংখ্যা যে অন্য একটি সংখ্যার সঙ্গে নির্দিষ্ট সম্পর্ক তৈরি করে—এই সত্যটি হয়তো মহাবিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই একই থাকবে।
গণিতের ইতিহাসে একটি আশ্চর্য ব্যাপার বারবার দেখা যায়। একই আবিষ্কার প্রায় একই সময়ে পৃথিবীর দুই প্রান্তে ঘটেছে। মোবিয়াস স্ট্রিপ আবিষ্কার করেছিলেন আগস্ট মোবিয়াস ও ইয়োহান বেনেডিক্ট লিস্টিং। ক্যালকুলাসের ধারণা নিয়ে কাজ করেছিলেন আইজ্যাক নিউটন ও গটফ্রিড লাইবনিজ। বিবর্তনের তত্ত্বে চার্লস ডারউইনের পাশাপাশি আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেসও একই ধরনের ধারণায় পৌঁছেছিলেন। হাইপারবোলিক জ্যামিতিতেও ইয়ানোশ বোলাই ও নিকোলাই লোবাচেভস্কি প্রায় একই সময়ে নতুন পথ খুলে দেন।
কেন এমন হয়?
সম্ভবত মানুষের জ্ঞান একসময় এমন একটি জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে একটি নতুন দরজা খোলার জন্য একাধিক মানুষ একই সময়ে হাত বাড়ান। একজন মানুষ যে জায়গায় এসে থামেন, অন্যজনও হয়তো সেখানেই এসে দাঁড়ান। তারপর দুজনেই একই অন্ধকারের মধ্যে নতুন পথ দেখতে পান।
এখানেই গণিতের সঙ্গে মানুষের ইতিহাসের একটি গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। আমরা আলাদা মানুষ, আলাদা ভাষায় কথা বলি, আলাদা দেশে জন্ম নিই। কিন্তু পৃথিবীকে বোঝার আমাদের ক্ষমতার মধ্যে এক ধরনের মিল আছে।
প্রাচীন গ্রিকরা সংখ্যাকে শুধু হিসাবের জন্য ব্যবহার করেনি। তারা সংখ্যার মধ্যে সৌন্দর্য খুঁজেছিল। পিথাগোরীয়রা বিশ্বাস করত, মহাবিশ্বের গভীরে সংখ্যার এক গোপন সুর রয়েছে। সংগীতের তারে নির্দিষ্ট অনুপাত যেমন সুন্দর শব্দ তৈরি করে, তেমনি প্রকৃতির অনেক ঘটনাতেও অনুপাত ও সংখ্যার ছাপ পাওয়া যায়।
পরে বিজ্ঞানীরা দেখলেন, পদার্থের গঠনেও নির্দিষ্ট অনুপাত কাজ করে। রসায়নে কোনো যৌগের উপাদান নির্দিষ্ট অনুপাতে মিলিত হয়। পদার্থবিজ্ঞানে আলো ও পরমাণুর আচরণ বোঝাতেও সংখ্যা ও সমীকরণ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ E=mc² মাত্র কয়েকটি চিহ্নে শক্তি ও ভরের গভীর সম্পর্ক প্রকাশ করে।
গণিত কখনো কখনো এমন সত্যের কাছে নিয়ে যায়, যা প্রথমে বাস্তব বলেই মনে হয় না। আবার সেই অদৃশ্য সত্যই পরে বাস্তব জগতের কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা হয়ে ওঠে।

জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ থেকে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের ধারণা পাওয়া যায়। পরে মানুষ রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করতে শেখে। পল ডিরাকের সমীকরণ এমন একটি কণার সম্ভাবনার কথা বলেছিল, যার অস্তিত্ব তখনও পরীক্ষায় ধরা পড়েনি। পরে সেই প্রতিকণার অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয়।
এই জায়গাতেই গণিত আমাদের একটু বিস্মিত করে। আমরা একটি সমীকরণ লিখি, আর বহু বছর পরে প্রকৃতি যেন এসে বলে—হ্যাঁ, তুমি যে কথাটি কাগজে লিখেছিলে, তা আমার ভেতরেও ছিল।
তবে গণিত সব সময় সহজ নয়। মানুষের মস্তিষ্ক দৈনন্দিন জীবন টিকে থাকার জন্য তৈরি হয়েছে। আমাদের পূর্বপুরুষদের হয়তো বুঝতে হতো কোথায় খাবার আছে, কোথা থেকে বিপদ আসছে, কোন পথে ফিরে যেতে হবে। অসীম, বহু-মাত্রিক জ্যামিতি বা বিমূর্ত সংখ্যাতত্ত্ব বোঝার জন্য আমাদের মস্তিষ্ক তৈরি হয়নি।
তবু মানুষ সেই সীমা অতিক্রম করার চেষ্টা করে।
কখনো একটি সমস্যা সমাধান করতে একজন গণিতবিদের বহু বছর কেটে যায়। কখনো একটি প্রমাণ এত দীর্ঘ হয় যে মানুষের পক্ষে তার প্রতিটি ধাপ নিজে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন কম্পিউটার এসে মানুষের পাশে দাঁড়ায়। কম্পিউটার শুধু হিসাব দ্রুত করে না; অনেক সময় এমন সম্পর্কও দেখতে সাহায্য করে, যা মানুষের চোখে ধরা পড়ে না।
এখানে গণিতের আরেকটি সৌন্দর্য আছে। আমরা জানি না কোনো সমস্যার উত্তর কেমন হবে। কিন্তু একবার উত্তরটি পেয়ে গেলে মনে হয়, সেটি যেন অনেক দিন ধরেই সেখানে অপেক্ষা করছিল।
গণিতের ইতিহাসে এমন অসংখ্য গল্প আছে। কোথাও একটি ছোট সংখ্যা বিশাল একটি তত্ত্বের দরজা খুলেছে। কোথাও একটি সরল রেখা নিয়ে ভাবতে গিয়ে মানুষ বহু-মাত্রিক জগতের কথা কল্পনা করেছে। কোথাও একটি অসম্ভব মনে হওয়া প্রশ্ন শত শত বছর ধরে মানুষকে তাড়া করেছে।
এই কারণেই গণিতের ইতিহাস আসলে মানুষের কৌতূহলের ইতিহাসও।
গণিতের সৌন্দর্য তার উত্তরেই শুধু নয়; প্রশ্নের মধ্যেও। একটি প্রশ্ন যখন জন্ম নেয়, তখন আমাদের সামনে একটি নতুন পৃথিবী খুলে যায়। আমরা জানি না সেখানে কী আছে। তবু আমরা এগিয়ে যাই।
গণিতের বইগুলো তাই শুধু সূত্র আর উপপাদ্যের তালিকা নয়। এগুলো মানুষের চিন্তার দীর্ঘ যাত্রার মানচিত্র। একটি আবিষ্কার আরেকটি আবিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত হয়। একটি ধারণা অন্য একটি ধারণাকে জন্ম দেয়। কখনো পুরোনো কোনো ভুল থেকে নতুন সত্য বেরিয়ে আসে।
ক্লিফোর্ড এ. পিকওভারের ‘দ্য ম্যাথ বুক’ এই দীর্ঘ ইতিহাসকে এমনভাবে সাজিয়েছে, যেখানে গণিতকে কেবল একটি কঠিন বিদ্যা হিসেবে দেখা হয় না। এখানে গণিত মানুষের কল্পনা, ভুল, বিস্ময়, আবিষ্কার এবং স্বপ্নের সঙ্গে পাশাপাশি হাঁটে।
সংখ্যার ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের ইতিহাস মিশে যায়। একটি সূত্রের পাশে এসে দাঁড়ায় একজন মানুষের জীবন। একটি জ্যামিতিক আকৃতির পাশে থাকে একটি পুরোনো সভ্যতার স্মৃতি। একটি সমীকরণের ভেতর কখনো লুকিয়ে থাকে মহাবিশ্বকে বোঝার মানুষের দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষা।
শেষ পর্যন্ত গণিত হয়তো আমাদের পৃথিবীকে পুরোপুরি বুঝিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু সে পৃথিবীর ওপর পড়ে থাকা কিছু পর্দা সরিয়ে দেয়।
তার ওপারে আমরা দেখি—একটি সংখ্যা, একটি রেখা, একটি অদৃশ্য আকৃতি, কিংবা এমন কোনো জগত, যার অস্তিত্ব আমরা আগে কল্পনাও করিনি।
আর তখন মনে হয়, গণিত আসলে সংখ্যার ভাষা নয় শুধু। এটি মানুষের সেই পুরোনো প্রশ্নের ভাষা—এই পৃথিবী এমন কেন? এবং তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—আমরা এখনো কী কী দেখতে পাইনি?
পরিচিতি
‘দ্য ম্যাথ বুক: ফ্রম পাইথাগোরাস টু দ্য ফিফটি-সেভেনথ ডাইমেনশন, টু হান্ড্রেড ফিফটি মাইলস্টোনস ইন দ্য হিস্ট্রি অব ম্যাথমেটিক্স (স্টার্লিং মাইলস্টোনস)’, লেখক: ক্লিফোর্ড এ. পিকওভার, প্রকাশক: ইউনিয়ন স্কোয়ার অ্যান্ড কোম্পানি মাইলস্টোনস, ৫২৭ পৃষ্ঠার বইটির দাম ২৭ ডলার।
ক্লিফোর্ড এ. পিকওভার ইয়েল ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেছেন। কম্পিউটার, গণিত, শিল্প, কৃষ্ণগহ্বর, সময় ভ্রমণ ও ভিনগ্রহের প্রাণসহ নানা বিষয়ে তিনি ৩০টির বেশি বই লিখেছেন। তার নামে রয়েছে কয়েক ডজন পেটেন্ট। তিনি বিভিন্ন জার্নালের সহযোগী সম্পাদক এবং ধাঁধা নির্মাতা হিসেবেও পরিচিত। কম্পিউটার গ্রাফিকস বহু জনপ্রিয় সাময়িকীর প্রচ্ছদে এবং টেলিভিশন অনুষ্ঠানে প্রকাশিত হয়েছে। তার ওয়েবসাইট পিকওভার ডট কম ও ব্লগ রিয়েলিটি কার্নিভাল ডট কম লাখো মানুষের কাছে জনপ্রিয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









