বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক আবারও আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। এবার কারণ একটি সহিংস চলচ্চিত্র, Citizen Vigilante। জার্মান পরিচালক উভে বোল নির্মিত এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন হলিউড অভিনেতা আর্মি হ্যামার। ছবিটি মুক্তির পর তেমন আলোচনায় না এলেও, ইলন মাস্ক নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম X-এ ৪৮ ঘণ্টার জন্য এটি বিনামূল্যে দেখার সুযোগ করে দিলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
মাস্কের এই পদক্ষেপের ফলে সিনেমাটি অ্যাপল ও অ্যামাজনের মতো বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে শুধু সিনেমা প্রচার নয়, এর সঙ্গে জড়িত তার রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্য নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সিনেমার গল্প
‘সিটিজেন ভিজিলেন্ট’-এর গল্পে দেখা যায়, একজন আমেরিকান ব্যক্তি একটি ইউরোপীয় দেশে গিয়ে নিজেই আইন হাতে তুলে নেন। তিনি পুলিশের সদস্য, বিচারক, ধর্ষকদের একটি দল, একটি শরণার্থী পরিবার এবং একজন সাধারণ নাগরিককে হত্যা করেন। তার দাবি, তিনি ইউরোপকে মুসলিম অভিবাসী ও তথাকথিত ‘ওয়োক’ রাজনীতির হাত থেকে রক্ষা করছেন।
ছবিটি অত্যন্ত সহিংস এবং এতে রক্তাক্ত দৃশ্যের আধিক্য রয়েছে। জার্মানির চলচ্চিত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রথমে ছবিটিকে রেটিং দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, এটি তেমন দর্শক পাবে না। কিন্তু ইলন মাস্কের প্রচারের পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
মাস্কের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
ইলন মাস্ক শুধু সিনেমাটি শেয়ারই করেননি, তিনি এমন একটি পোস্টও রিপোস্ট করেন যেখানে বলা হয়, অভিবাসীদের অপরাধের জবাবে সাধারণ মানুষের হাতে আইন তুলে নেওয়া ‘মধ্যপন্থী প্রতিক্রিয়া’।
সমালোচকদের মতে, একজন বিশ্বখ্যাত ব্যবসায়ী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মালিক হিসেবে মাস্কের এমন পদক্ষেপ সহিংসতা ও বিদ্বেষকে উৎসাহিত করতে পারে। তবে তাঁর সমর্থকদের দাবি, তিনি শুধু মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করছেন।
ইউরোপের ডানপন্থী রাজনীতিতে মাস্ক
গত কয়েক বছরে ইলন মাস্ক ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ডানপন্থী রাজনৈতিক নেতা ও দলগুলোর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছেন।কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক জর্জিওস সামারাস বলেন, ‘মাস্ক এখন একটি আদর্শিক লড়াইয়ে নেমেছেন। তিনি নিজের অর্থ, জনপ্রিয়তা ও X প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এমন রাজনৈতিক ধারণা ছড়িয়ে দিতে চান, যা তিনি সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কাজ শেষ হওয়ার পর মাস্ক এখন ইউরোপের রাজনৈতিক বিতর্কেও আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।
X-এর প্রভাব
২০২২ সালে টুইটার কিনে এর নাম পরিবর্তন করে X রাখেন ইলন মাস্ক। এরপর তিনি আগের অনেক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের নিয়ম বাতিল করেন। তার মতে, এতে বাকস্বাধীনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্তের ফলে X-এ ঘৃণামূলক বক্তব্য, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং চরম ডানপন্থী মতাদর্শ আগের তুলনায় বেশি ছড়িয়ে পড়েছে। গবেষকদের মতে, শুধু X-এর পরিবেশই বদলায়নি, বরং এই প্ল্যাটফর্মে থাকা বিভিন্ন মতাদর্শও মাস্কের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছে।
শ্বেতাঙ্গদের নিয়ে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক সময়ে মাস্ক বহুবার এমন পোস্ট করেছেন বা শেয়ার করেছেন, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তারা হুমকির মুখে পড়বে।
তিনি ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী নেতা মেরিন লে পেন-কে সমর্থন করে লিখেছিলেন, "তিনি ফ্রান্সের শেষ আশা।"
এছাড়া তিনি যুক্তরাজ্যের বিতর্কিত ডানপন্থী কর্মী টমি রবিনসন-এর ভিডিও ও বক্তব্যও শেয়ার করেছেন। সেই ভিডিওতে অভিযোগ করা হয়েছিল, পুলিশ অপরাধীদের বিরুদ্ধে সমানভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
যুক্তরাজ্যে বিতর্ক
উত্তর আয়ারল্যান্ডে এক সুদানি নাগরিকের বিরুদ্ধে ছুরিকাঘাতের অভিযোগ ওঠার পর টমি রবিনসন যে বিক্ষোভের তালিকা প্রকাশ করেছিলেন, সেটিও মাস্ক শেয়ার করেন। তিনি লেখেন, ‘বারবার এবং জোরালোভাবে প্রতিবাদ করলেই পরিবর্তন আসবে।’
এরপর বেলফাস্টে সহিংস দাঙ্গা শুরু হয়। পুলিশ জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এসব ঘটনার সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
ডিজিটাল ঘৃণামূলক বক্তব্য নিয়ে কাজ করা সংস্থা সিসিডিএইচ দাবি করেছে, মাস্ক, টমি রবিনসন এবং রুপার্ট লোর পোস্টের নিচে হাজার হাজার সহিংস মন্তব্য দেখা গেছে।
‘রিমাইগ্রেশন’ কী?
ইলন মাস্ক সম্প্রতি ‘রিমিগ্রেশন’ শব্দটিরও সমর্থন করেছেন।
এই ধারণা অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো উচিত। চরম ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর কিছু অংশ এমনকি বহু বছর ধরে ইউরোপে বসবাসকারী বা সেখানেই জন্ম নেওয়া বিদেশি বংশোদ্ভূত মানুষদেরও দেশ ছাড়ার পক্ষে মত দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারণার সঙ্গে কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সম্পর্ক রয়েছে এবং এটি অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কিত।
বার্লিন হামলার পর নতুন বিতর্ক
বার্লিনে একটি প্রাইড অনুষ্ঠানে হামলার পর ইউরোপের কয়েকজন ডানপন্থী প্রভাবশালী ব্যক্তি আবারও "রিমাইগ্রেশন"-এর দাবি তোলেন।
এর জবাবে মাস্ক একটি পোস্টে লেখেন, "যে রিমাইগ্রেশনের বিরোধিতা করে, সে বিশ্বাসঘাতক।"
এই মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করে।
সিনেমা নিয়ে সমালোচনা
‘সিটিজেন ভিজিলেন্ট’ শুধু রাজনৈতিকভাবেই নয়, চলচ্চিত্র হিসেবেও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিখ্যাত সাময়িকী Variety ছবিটিকে ‘অবিশ্বাস্য রকমের খারাপ’ বলে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে মার্কিন রক্ষণশীল লেখক রড ড্রেহার একে "ফ্যাসিবাদী প্রচারণা" বলে আখ্যা দেন। পরিচালক উভে বোলের দাবি, মাস্কের প্রচারের কারণে ছবিটি প্রায় ৬ লাখ ডলার আয় করেছে।
মাস্কের বক্তব্য
এক সাক্ষাৎকারে ইলন মাস্ককে প্রশ্ন করা হয়, একটি মুসলিম পরিবারকে হত্যার দৃশ্য দেখানো সিনেমা প্রচার করা কি দায়িত্বশীল কাজ? জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি একটি সিনেমা এবং দেখার মতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি না ইউরোপ নরক হয়ে গেছে। তবে সেখানে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল।’ এছাড়া তিনি আগের মতোই দাবি করেন, যুক্তরাজ্যে ভবিষ্যতে গৃহযুদ্ধ হওয়া "অনিবার্য" হতে পারে।
সমর্থক ও সমালোচকদের মত
মাস্কের সমর্থকদের মতে, তিনি শুধু বাকস্বাধীনতার পক্ষে কথা বলছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের মত প্রকাশ করছেন। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে তার প্রতিটি বক্তব্য কোটি কোটি মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই এমন সহিংস বা বিভাজনমূলক বার্তা আরও বেশি উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
তবে সবাই মনে করেন না যে ইউরোপের রাজনীতিতে মাস্কের প্রভাব খুব বেশি। যুক্তরাজ্যের রিফর্ম ইউকের সাবেক মুখপাত্র গাওয়েইন টাউলার বলেন, তার মতে মাস্কের রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত।
ইলন মাস্ক এখন শুধু একজন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা নন, তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সামাজিক বিতর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। ‘সিটিজেন ভিজিলেন্ট’ চলচ্চিত্রকে সমর্থন এবং ইউরোপের ডানপন্থী রাজনীতির প্রতি তার প্রকাশ্য সমর্থন নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের কর্মকাণ্ড সমাজ ও রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।
সমর্থকদের কাছে তিনি বাকস্বাধীনতার রক্ষক হলেও, সমালোচকদের মতে তাঁর কর্মকাণ্ড সমাজে বিভাজন, বিদ্বেষ এবং চরমপন্থী চিন্তার বিস্তারকে আরও উৎসাহিত করতে পারে। এই বিতর্ক আগামী দিনেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









