ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী পরিচালক সৃজিত মুখার্জি এবার পর্দায় তুলে ধরতে চলেছেন সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী সিনেমা ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ তৈরির গল্প। নতুন ছবিটির নাম ‘মহারাজা তোমারে সেলাম’—যা ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ ছবিরই একটি জনপ্রিয় গানের নাম।
ছবিতে অভিনয় করছেন জিতু কমল, ঋত্বিক ভৌমিক, রুদ্রনীল ঘোষ, শতাক্ষী নন্দী, সায়রিতি ব্যানার্জি ও অরিজিৎ দত্ত। ছবিটি প্রযোজনা করছে হইচই স্টুডিও ও ফ্রেন্ডস কমিউনিকেশন, সঙ্গে রয়েছে ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর মূল প্রযোজনা সংস্থা পিয়ালি ফিল্মস প্রাইভেট লি.
‘মহারাজা তোমারে সেলাম’-এর কেন্দ্রে থাকবেন সত্যজিৎ রায় নিজেই। কীভাবে রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত কলকাতার পরিবেশে নানা চাপের মুখে দাঁড়িয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর মতো একটি ছবি তৈরি করেছিলেন, সেই গল্পই তুলে ধরবেন সৃজিত।
ছবিটির প্রধান শুটিং শুরু হবে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে।

যে ছবিকে ঘিরে নতুন সিনেমা
১৯৬৯ সালের ৮ মে মুক্তি পায় ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’। ছবির কেন্দ্রে ছিল দুই অদক্ষ গ্রামের সংগীতশিল্পী—গুপী ও বাঘা। চরিত্র দুটিতে অভিনয় করেছিলেন তপেন চট্টোপাধ্যায় ও রবি ঘোষ।
গান গাওয়া ও বাজানোর ক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষ না হওয়ায় তারা নিজেদের গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়। পরে ভূতের রাজা তাদের জাদুকরি ক্ষমতা দেন। সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে তারা দুই শত্রু রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ ঠেকানোর চেষ্টা করে।
তবে রূপকথার আবরণের নিচে ছবিটিতে ছিল সমাজ ও রাজনীতির নানা ইঙ্গিত। শ্রেণিবৈষম্য এবং শিল্পের ভূমিকা নিয়ে সত্যজিৎ রায় গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছিলেন।
১৯৮০ সালের সিক্যুয়েল ‘হীরক রাজার দেশে’-তে এই রাজনৈতিক বক্তব্য আরও সরাসরি হয়ে ওঠে। সেখানে রায় স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ব্যঙ্গ করেন। পরে ১৯৯২ সালে তার ছেলে সন্দীপ রায় ত্রয়ীটির শেষ ছবি ‘গুপী বাঘা ফিরে এলো’ নির্মাণ করেন।
সত্যজিৎ রায়কে ঘিরে সৃজিতের নতুন কাজ
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সত্যজিৎ রায় ভারতীয় চলচ্চিত্রে অসাধারণ সব কাজ রেখে গেছেন। তার উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে ‘পথের পাঁচালী’ ও ‘চারুলতা’। ১৯৯২ সালে মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি চলচ্চিত্রে আজীবন অবদানের জন্য সম্মানসূচক অস্কার পান। এই সম্মান পাওয়া তিনিই প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা।
সৃজিত মুখার্জি বলেন, “ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ কীভাবে ভাবা হয়েছিল এবং তৈরি হয়েছিল, সেই অবিশ্বাস্য সত্য ঘটনাটিই আমি বলতে চাইছি।”
সৃজিতের উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে ‘চতুষ্কোণ’, যার জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। এছাড়া তার পরিচালিত ছবির মধ্যে রয়েছে ‘জাতিস্মর’ ও ‘বাইশে শ্রাবণ’। বাংলা সংস্কৃতি ও গল্প বলার ঐতিহ্যের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ‘মহারাজা তোমারে সেলাম’-এর মাধ্যমে তিনি এবার ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে তুলে ধরছেন।

রায়কে নিয়ে বাংলা সিনেমার আরো কিছু কাজ
সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র-ঐতিহ্য নিয়ে এর আগেও বেশ কয়েকটি বাংলা ছবি তৈরি হয়েছে।
অনীক দত্তের ‘অপরাজিত’-তে ‘পথের পাঁচালী’ তৈরির গল্প দেখানো হয়েছিল। সেখানে জিতু কমল সত্যজিৎ রায়ের আদলে তৈরি একটি চরিত্রে অভিনয় করেন।
অন্যদিকে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘অপুর পাঁচালী’-তে ‘পথের পাঁচালী’-র অপুর চরিত্রে অভিনয় করা শিশুশিল্পী সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরবর্তী জীবনের গল্প তুলে ধরেন।
এছাড়া সৃজিত মুখার্জির প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি ‘অটোগ্রাফ’ ছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’-এর প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
‘মহারাজা তোমারে সেলাম’-এর মাধ্যমে সৃজিত আবারো সত্যজিৎ রায়ের আরেকটি ঐতিহাসিক সৃষ্টির নেপথ্যের গল্প দর্শকদের সামনে আনতে চলেছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









