মার্টিন ম্যাকডোনার নতুন সিনেমায় ১৯৭০-এর দশকের এক সিআইএ কর্মকর্তার বিবেকের দ্বন্দ্ব উঠে এসেছে। জন মালকোভিচ অভিনীত ছবিটি মার্কিন দর্শকদের মধ্যে বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
বিভিন্ন সিনেমায় মার্টিন ম্যাকডোনা দেখিয়েছেন দুই ভিন্ন বয়সী মানুষের অদ্ভুত সম্পর্ক, তর্ক আর সংঘাত। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে নতুন সিনেমা ওয়াইল্ড হর্স নাইন-এ সেই পরিচিত গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির কঠোর সমালোচনা।
আইরিশ পরিচালক ম্যাকডোনার নতুন এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন জন মালকোভিচ ও স্যাম রকওয়েল। তারা অভিনয় করেছেন ১৯৭০-এর দশকের দুই সিআইএ কর্মকর্তার চরিত্রে। সিনেমাটি একদিকে রসাত্মক, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে বেশ তীক্ষ্ণ।
ম্যাকডোনা নিজেই বলেছেন, এটি তার সবচেয়ে রাজনৈতিক সিনেমা। তার আগের সিনেমা ‘ইন ব্রুজেস’ এবং ‘দ্য ব্যানশিজ অব ইনিশেরিন’ ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিল। দ্য ব্যানশিজ অব ইনিশেরিন নয়টি অস্কারের মনোনয়নও পেয়েছিল।

চিলিতে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা
ওয়াইল্ড হর্স নাইন-এর গল্পের সময় ১৯৭৩ সাল। মালকোভিচ ও রকওয়েল অভিনীত ক্রিস ও লি নামের দুই সিআইএ কর্মকর্তা তখন চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোয় কর্মরত। বিদেশি সরকারকে অস্থিতিশীল করা এবং বামপন্থী হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের হত্যার মতো কাজ করাই ছিল তাদের দায়িত্ব।
তারা তখন চিলির সদ্য নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আয়েন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনায় যুক্ত।
কিন্তু অবসরের সময় ঘনিয়ে আসায় ক্রিসের মনে প্রশ্ন জাগতে শুরু করে। এত বছর ধরে যেসব হত্যা ও অভ্যুত্থানে তিনি অংশ নিয়েছেন, সেগুলো কি সত্যিই ‘বৃহত্তর স্বার্থে’ করা হয়েছিল?
এই প্রশ্নই ধীরে ধীরে সিনেমার মূল বিষয় হয়ে ওঠে।
ইস্টার আইল্যান্ডে গোপন কথা
গল্পের একপর্যায়ে ক্রিস ও লি ছুটিতে যায় প্রশান্ত মহাসাগরের ইস্টার আইল্যান্ডে। বিশাল মোয়াই মূর্তির জন্য বিখ্যাত এই দ্বীপে গিয়ে ক্রিস পর্যটনে খুব একটা আগ্রহ দেখায় না। বরং সে নিজের স্মৃতিকথা লেখার কাজে মন দেয়।
বৃদ্ধ হওয়ার আগে এবং স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার আগে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো লিখে রাখতে চায় সে। কিন্তু সমস্যা হলো, ক্রিস অচেনা মানুষদের কাছেও তার গোপন কর্মকাণ্ডের কথা বলতে শুরু করে। এমনকি দুই চিলিয়ান শিক্ষার্থীর সঙ্গেও সে এসব নিয়ে কথা বলে।
এতে সিআইএর সান্তিয়াগো প্রধান এমজে চিন্তিত হয়ে পড়েন। তার আশঙ্কা, ক্রিস হয়তো গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য প্রকাশ করে ফেলবে। তাই তিনি লিকে নির্দেশ দেন—ক্রিস যেন জীবিত অবস্থায় ইস্টার আইল্যান্ড থেকে ফিরতে না পারে।
এর মধ্যেই সিনেমায় উঠে আসে গণতন্ত্র, বন্ধুত্ব এবং মানুষের বিবেক নিয়ে নানা অদ্ভুত ও দীর্ঘ কথোপকথন। ম্যাকডোনার স্বভাবসুলভ কৌতুক ও তীক্ষ্ণ সংলাপের পাশাপাশি রয়েছে দুই পুরুষের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের আবেগময় গল্প।
ক্রিসের চরিত্রে জন মালকোভিচও পেয়েছেন তার ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। চরিত্রটিতে তার পরিচিত অস্বস্তিকর ও রহস্যময় উপস্থিতির পাশাপাশি দেখা যায় একজন ভঙ্গুর ও অনুতপ্ত মানুষের মুখ। এ কারণেই তাকে আগামী অস্কারে সেরা অভিনেতার সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনা করা হচ্ছে।

সিআইএ নিয়ে হলিউডের নতুন অবস্থান
হলিউডের সিনেমায় সিআইএকে কখনো নায়ক হিসেবে দেখানো হয়েছে, আবার কখনো কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। জ্যাক রায়ান সিরিজে সিআইএর ইতিবাচক চিত্র যেমন দেখা যায়, তেমনি ‘থ্রি ডেজ অব দ্য কনডর’-এর মতো সিনেমায় উঠে এসেছে সংস্থাটির অন্ধকার দিক।
জন মালকোভিচ নিজেও এর আগে সিআইএ-সংশ্লিষ্ট চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ১৯৯৩ সালের ‘ইন দ্য লাইন অব ফায়ার’ সিনেমায় তিনি সাবেক সিআইএ কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয় করেন। ‘বার্ন আফটার রিডিং’ সিনেমাতেও তাকে দেখা যায় এক সাবেক সিআইএ কর্মকর্তার ভূমিকায়, যে নিজের স্মৃতিকথা প্রকাশ করতে চায়।
তবে ‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’ আরও সরাসরি সিআইএর সমালোচনা করেছে। এখানে কোনো ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ বা বিচ্ছিন্ন কয়েকজন কর্মকর্তাকে দায়ী করা হয়নি। বরং সিনেমাটি দেখাতে চায়, সিআইএর কর্মকর্তারা তাদের কাজ দক্ষতার সঙ্গে এবং অনেক সময় আনন্দের সঙ্গেই করেন। কিন্তু সেই কাজের ফল ভয়াবহ ও অন্যায্য।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা দাঁড়ায়—ক্রিস কি নিজের অতীত কাজের জন্য অনুতপ্ত হবে? আর পরিচালক ম্যাকডোনার জন্য আরও বড় প্রশ্ন হলো, তার এই তীব্র রাজনৈতিক বক্তব্য মার্কিন দর্শক ও অস্কার ভোটারদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে।
সেখানেই ‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’ হয়ে উঠতে পারে শুধু একটি গুপ্তচর-কাহিনি নয়, বরং আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি ও ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









