মাই লাইফ অন দ্য রোড , লেখক: গ্লোরিয়া স্টেইনেম, প্রকাশক: র্যান্ডম হাউস , ৩০৪ পৃষ্ঠার বইটির দাম ২৮ ডলার।
গ্লোরিয়া স্টেইনেম একজন বাস্তব মানুষ। কথাটি খুব সাধারণ। অথচ তার ‘মাই লাইফ অন দ্য রোড’ পড়তে পড়তে এই সাধারণ কথাটিই একসময় অদ্ভুত হয়ে ওঠে। কারণ এত বছর ধরে আমরা যে গ্লোরিয়া স্টেইনেমকে চিনি, তিনি যেন একজন মানুষ নন, একটি পরিচিত ছবি—অ্যাভিয়েটর চশমা, মাঝখান দিয়ে সিঁথি করা লম্বা চুল, শান্ত মুখ, আর নারীর স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় কণ্ঠস্বর।
আমরা তাকে চিনি নারীবাদী আন্দোলনের ‘সেকেন্ড ওয়েভ’র একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে। চিনি মিস. ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। চিনি নারীর সমঅধিকার, নাগরিক অধিকার, গর্ভপাতের অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়ের আন্দোলনের একজন নির্ভীক কর্মী হিসেবে।
কিন্তু এসব পরিচয়ের আড়ালে যে মানুষটি ছিলেন, তাকে আমরা কতটা চিনতাম? এই প্রশ্নটিই তার স্মৃতিকথা ‘মাই লাইফ অন দ্য রোড’-এর মূল আকর্ষণ।
স্টেইনেম প্রায় ছয় দশক ধরে জনসমক্ষে ছিলেন। কিন্তু অন্য অনেক নারীর মতো তার পরিচয় কোনো সম্পর্কের মধ্যে আটকে থাকেনি। তিনি কারও স্ত্রী হিসেবে পরিচিত হননি, কারও মা হিসেবে নয়, এমনকি কোনো বিখ্যাত পুরুষের সঙ্গী হিসেবেও নয়। তিনি ছিলেন শুধু—গ্লোরিয়া স্টেইনেম।

হয়তো এ কারণেই তার শৈশবের গল্প পড়তে গিয়ে প্রথমে আমরা একটু অবাক হই। আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো দারিদ্র্য আর কষ্টে ভরা কোনো শৈশবের গল্প পাব। কিন্তু বইয়ের শুরুতে যে পরিবারটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়, তারা ওহাইওর টোলিডোতে বেশ আনন্দেই বাস করছে। সেখানে আছেন গ্লোরিয়ার মা, তার বোন এবং বাবা লিও।
আর লিও যেন এই পরিবারের সবচেয়ে বড় চরিত্র। তিনি ছিলেন জার্মান ও পোলিশ ইহুদি অভিবাসীদের সন্তান। এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকা তার স্বভাবে ছিল না। গ্রীষ্ম শেষ হলেই, তার বিনোদনকেন্দ্রের কাজ যখন কমে আসত, তিনি স্ত্রী ও দুই মেয়েকে গাড়িতে তুলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তেন।
স্কুল শুরু হওয়ার সময় অন্য শিশুরা শ্রেণিকক্ষে ফিরত। গ্লোরিয়া তখন বসে থাকতেন পরিবারের গাড়িতে। এক শহর থেকে আরেক শহর। এক উষ্ণ জায়গা থেকে আরেক উষ্ণ জায়গা। গাড়ির জানালার বাইরে পৃথিবী বদলাত। আর ভেতরে গ্লোরিয়া বই পড়তেন। তিনি তার পছন্দের বই পড়তেন, ঘোড়ার সঙ্গে সময় কাটাতেন, আর রাস্তার পাশের ছোট ছোট দোকান ও বাড়ির উঠানের থেকে তার বাবা যে পুরোনো জিনিস কিনতেন, সেগুলোর মধ্যে মূল্যবান জিনিস খুঁজে বের করতে শিখতেন।
লিও তাকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে ধাতু ও রত্নের আসল মূল্য বুঝতে হয়। পরিবারের জীবনে এই ছোট ছোট জিনিসই ছিল সম্পদ। তার বাবা কখনো কখনো পকেটে টিস্যু পেপারে মোড়ানো ছোট ছোট রত্ন নিয়ে ঘুরতেন। প্রথমে তিনি সেগুলো পছন্দ করতেন, জমিয়ে রাখতেন। পরে সেগুলো বিক্রি করে পরিবারের খাবার এবং গাড়ির জ্বালানির খরচ চালাতেন।
গ্লোরিয়া তার বাবাকে কখনো প্রতারক হিসেবে দেখেননি। তার স্মৃতিতে এই মানুষটি বরং এক অদ্ভুত, স্বাধীনচেতা, ভালোবাসায় ভরা বাবা—যিনি পরিবারকে নিয়ে সব সময় পথে থাকতে চাইতেন।
তবু এই গল্পের মধ্যে অনেক নীরবতা আছে।
গ্লোরিয়া ‘মাই লাইফ অন দ্য রোড’র লিখেছেন, ‘পেপার মুন’ সিনেমায় বাবা-মেয়ের সম্পর্ক দেখে তার নিজের শৈশবের কথা মনে হয়েছিল। বাক্যটি পড়ে মনে হয়, এর পর নিশ্চয়ই আরও কিছু বলা হবে।
কিন্তু তিনি আর কিছু বলেননি। এটাই স্টেইনেমের স্মৃতিকথার একটি বিশেষ স্বভাব ভঙ্গি। তিনি জীবনের একটি দরজা খুলে দেন। আমরা ভেতরে তাকাই। কিছু দেখতে পাই। তারপর দরজাটি আবার বন্ধ হয়ে যায়।
তার মা-ও এমন এক বন্ধ দরজার মতো।
তিনি শিক্ষিত ছিলেন, সাংবাদিকও ছিলেন। কিন্তু মানসিক অসুস্থতা এবং সেই সময়ের নারীদের জন্য তৈরি সামাজিক সীমাবদ্ধতা তার কর্মজীবন থামিয়ে দেয়। মায়ের জীবন সম্পর্কে পড়তে গিয়ে পাঠকের মনে হয়—আরও জানতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু গ্লোরিয়া সামনে এগিয়ে যান। স্মিথ কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে সাংবাদিকতা শুরু করার পর তিনি বুঝতে পারেন, তার নিজের জীবন অনেকটা সেই জীবন, যা তার মা উপভোগ করতে পারেননি।
কিন্তু একই সঙ্গে তিনি তার বাবার মেয়েও রয়ে গেলেন। তিনি স্থির হয়ে থাকলেন না। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গেলেন। এক মানুষের সঙ্গে আরেক মানুষের পরিচয় হলো। আর ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে শুরু করলেন, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়তো সোনা বা রত্ন নয়—মানুষ ও মানুষের সাথে সম্পর্ক।
যাদের সঙ্গে পথে দেখা হয়, তাদের গল্প। বিশেষ করে নারীদের গল্প। স্টেইনেমের জীবনে তাই ভ্রমণ শুধু ভ্রমণ নয়। প্রতিটি শহর, প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি মানুষের সঙ্গে দেখা যেন তার নিজের জীবনের আরেকটি পৃষ্ঠা।

তবু তিনি খুব কমই পেছনে তাকান। তার স্মৃতিকথায় অনুশোচনা নেই বললেই চলে। একটি বড় আফসোস অবশ্য আছে—বাবা মারা যাওয়ার আগে তার কাছে থাকতে পারেননি। তারপর তার মা এবং বোন যেন গল্পের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যান। কিন্তু শুধু পরিবার নয়, অন্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গ্লোরিয়া একটি দূরত্ব রেখে কতা বলেন।
উইলমা ম্যানকিলারের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল গভীর। দুজনের মধ্যে ছিল ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং এক ধরনের অখন্ডতা। ম্যানকিলারের মৃত্যুর পর তার শোকও আমরা অনুভব করি। কিন্তু সেটি খুব সোচ্চারভাবে নয়।
শোকটি যেন বইয়ের পাতার মাঝখানে রাখা একটি পুরোনো চিঠির মতো—খোলা নয়, তবু উপস্থিত। স্টেইনেমের জীবনে বিংশ শতকের বহু বিখ্যাত লেখক, শিল্পী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এসেছেন। কিন্তু তার স্মৃতিকথায় তাদের নামের ভিড় নেই।
এটি তার বই ‘মাই লাইফ অন দ্য রোড’র সবচেয়ে ভালো দিক। তিনি পরিচিত মানুষের নাম ব্যবহার করে নিজের গুরুত্ব বাড়াতে চাননি। বরং তিনি বেশি লিখেছেন নারীদের নিয়ে। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নারী, নারী আন্দোলনের কর্মী, আদিবাসী নেত্রী—তাদের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা।
এই জায়গায় এসে বইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা সামনে আসে—‘টকিং সার্কেল’। এটি আদিবাসী আমেরিকানদের একটি ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি। সবাই একটি বৃত্তে বসে। কেউ কথা বলে, অন্যরা শোনে। কেউ নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেয়। অন্য কেউ হয়তো তার উত্তর দেয়।
কেউ কারও ওপরে নয়। সবাই একই বৃত্তের অংশ। সমস্যার সমাধান সব সময় সঙ্গে সঙ্গে হয় না। কিন্তু মানুষ একে অন্যকে একটু ভালোভাবে বুঝতে শেখে। তারপর আবার সামনে এগিয়ে যায়।
সম্ভবত এই ধারণাটিই স্টেইনেমের জীবনকে সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝার একটা পদ্ধতি হতে পারে।
তিনি মানুষের কথা শুনেছেন। শুধু নিজের কথা বলেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, পরিবর্তন কোনো একজন মহান মানুষের হাতে তৈরি হয় না। মানুষ পাশাপাশি দাঁড়ালে পরিবর্তন আসে। তার কাছে নায়ককে ওপরে খুঁজে দেখার চেয়ে চারদিকে তাকানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
হয়তো এই কারণেই তার নিজের জীবনও কখনো সম্পূর্ণ আত্মজীবনী হয়ে ওঠে না। তিনি নিজের গল্প বলতে বলতে অন্য মানুষের গল্পে চলে যান।
একটি রাস্তা তাকে আরেকটি রাস্তায় নিয়ে যায়। একজন মানুষ তাকে আরেকজন মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। একটি স্মৃতি আরেকটি স্মৃতির দরজা খুলে দেয়। তারপর তিনি আবার চলে যান।
এই জন্যই ‘মাই লাইফ অন দ্য রোড’ পড়তে পড়তে আপনার কখনো মনে হবে, গ্লোরিয়া স্টেইনেম যেন আপনার পাশের সিটে বসে আছেন—কোনো ট্রেনে, কোনো বিমানে, কিংবা রাতের অন্ধকারে মহাসড়ক ধরে ছুটে চলা গাড়িতে।
তিনি গল্প করছেন। জানালার বাইরে শহর পেরিয়ে যাচ্ছে। একটি শহরের আলো শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি শহরের আলো দেখা যাচ্ছে। আমরা তার গল্প শুনছি। আর ভাবছি, এই গল্পটি নিশ্চয়ই আরও একটু দীর্ঘ হবে।
কিন্তু ঠিক যখন মনে হয় এবার তার জীবনের গভীরে পৌঁছাব, তিনি যেন হেসে বিদায় জানান এবং পরের যাত্রার দিকে এগিয়ে যান। তার জীবনেও যেন এটাই নিয়ম ছিল—
থেমে থেকো না।
পেছনে তাকিয়ে থেকো না।
মানুষের পাশে দাঁড়াও।
আর সামনে এগিয়ে যাও।
গ্লোরিয়া স্টেইনেমের স্মৃতিকথার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এখানেই। তিনি নিজের জীবনকে স্মৃতির একটি বন্ধ ঘর বানাননি। বরং সেটিকে রেখেছেন একটি দীর্ঘ রাস্তার মতো—যেখানে প্রতিটি বাঁকে নতুন মানুষ, নতুন গল্প এবং নতুন প্রশ্ন অপেক্ষা করছে।
আর আমরা পাঠকরা সেই রাস্তায় তার পাশে কিছুদূর হাঁটি। তারপর তিনি চলে যান। রাস্তা থেকে আরেক রাস্তায়। আমাদের রেখে যান তার গল্পের সঙ্গে, আর একটি ছোট্ট আফসোসের সঙ্গে—
ইশ, যদি তিনি আর একটু থেকে যেতেন। আরও কিছু গল্প শুনাতেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









