২৪ বছর পর ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ফিরেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার খ্যাতিমান নির্মাতা লি চ্যাং-দং। তার নতুন ছবি ‘পসিবল লাভ’ প্রদর্শনের পর সালা গ্রান্দে প্রেক্ষাগৃহে ছয় মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়েছেন দর্শকেরা। সেই অভ্যর্থনায় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ছবির অভিনয়শিল্পীরাও। ভেনিসে প্রতিযোগিতা বিভাগে এটি লির প্রথম ছবি প্রায় ২৪ বছর পর। ২০০২ সালে ‘ওয়েসিস’ ছবির জন্য তিনি জিতেছিলেন সিলভার লায়ন। ২০১৮ সালের ‘বার্নিং’-এর পর এটিই তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ২০২৬ ভেনিস জুরি এওয়ার্ড পেল ‘পসিবল লাভ’। ছবিটি তৈরি করতে এত সময় লাগার কারণও জানিয়েছেন পরিচালক। তার ভাষায়, ছবি শুরু করার আগে সেটি তার কাছে, দর্শকের কাছে এবং সিনেমার কাছে কী অর্থ বহন করে—তা নিশ্চিত হতে হয়। ‘পসিবল লাভ’র জন্য ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৬-এ জুরি পুরস্কার পেয়েছেন নির্মাতা লি চ্যাং-দং ।
‘পসিবল লাভ’ নামটিও তাই একটি প্রশ্নের মতো: কী সেই ভালোবাসা, যা সত্যিই সম্ভব?
লি চ্যাং-দংয়ের ‘পসিবল লাভ’ শুরু হয় একটি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। একটি গাড়ির ভেতর বসে আছে দুজন মানুষ। তারা কথা বলছে, কিন্তু সেই কথার মধ্যে শোকের চেয়ে বেশি আছে অস্বস্তি—কীভাবে একজন মানুষের মৃত্যু আরেকজন মানুষের জীবনে এসে বসে পড়ে, কীভাবে পুরোনো সম্পর্কগুলো মৃত্যুর পরও শেষ হয় না।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত এই ছবিতে মি-ওক ও হো-সক বহুদিনের পরিচিত। তাদের জীবন একসময় কাছাকাছি ছিল। এখন তারা আলাদা। মি-ওক একটি কারখানায় কাজ করেন। হো-সকও নিজের জীবনের অনিশ্চয়তা সামলাতে ব্যস্ত। তাদের চারপাশের পৃথিবী বদলে গেছে—কাজের নিরাপত্তা কমেছে, চাকরি হারানোর ভয় বেড়েছে, মানুষের হাতে সময় ও অর্থ দুটোই কমেছে। সম্পর্কের ভেতরেও তাই আর আগের মতো নিশ্চয়তা নেই।
মি-ওকের ছেলে জং সপ এবং হো-সকের পরিচিত সাং-উ—তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি। তাদের জীবনেও ভবিষ্যৎ যেন কোনো স্থির জায়গা নয়। কাজ আছে কি নেই, কোথায় থাকা যাবে, কী কেনা সম্ভব—এসব প্রশ্ন ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিশে যায়।
এই ছবির বিশেষত্ব হলো, লি চ্যাং-দং এসব কথা বক্তৃতার মতো বলেন না। তিনি কাউকে দাঁড় করিয়ে অর্থনৈতিক সংকটের ব্যাখ্যা দেন না। বরং একটি ব্যাকপ্যাক, একটি চাকরি, একটি ফোনের স্ক্রিন, কারও মুখের ক্লান্তি—এই ছোট ছোট জিনিসের মধ্য দিয়ে সময়টাকে দেখান।
এক জায়গায় মি-ওক একটি লোরো পিয়ানা ব্যাকপ্যাকের দিকে তাকান। ব্যাগটির দাম তার নাগালের বাইরে। তিনি গুগলে সেটির ছবি খোঁজেন। দৃশ্যটি খুব ছোট। কিন্তু এখানেই ছবির পৃথিবীটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানুষের আকাঙ্ক্ষা এখন কেবল প্রেমিক বা প্রেমিকার জন্য নয়; একটি ব্যাগ, একটি পোশাক, একটি জীবনযাপনের ধরনও হয়ে উঠেছে আকাঙ্ক্ষার বস্তু। বাজার আমাদের বলে দেয় কী চাইতে হবে, অথচ সেই চাওয়ার সামর্থ্য সবার নেই।
ছবিটি তাই প্রেমের গল্প হলেও কেবল প্রেমের গল্প নয়।

মি-ওক শ্রমজীবী মানুষের ওপর একটি তথ্যচিত্র তৈরির কাজেও যুক্ত হন। ক্যামেরার সামনে যারা কথা বলেন, তাদের জীবন তার নিজের জীবন থেকে খুব দূরে নয়। কাজ, ছাঁটাই, টিকে থাকা—এসব কোনো বিমূর্ত রাজনৈতিক শব্দ নয়। এগুলো মানুষের প্রতিদিনের হিসাব।
হো-সকের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। একসময় যে মানুষটি হয়তো ভবিষ্যৎ নিয়ে সহজে ভাবতে পারতেন, এখন তাকে প্রতিটি সিদ্ধান্তের আগে হিসাব করতে হয়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মানুষের শুধু আয় কমায় না; এটি সম্পর্কের ভাষাও বদলে দেয়। ভালোবাসার জায়গায় সন্দেহ আসে, ঘনিষ্ঠতার জায়গায় সংকোচ। কেউ কাউকে ছেড়ে যেতে চায় না, অথচ কেউই নিশ্চিত নয় যে অন্য একজনকে সঙ্গে নিয়ে বেঁচে থাকার সামর্থ্য তার আছে।
এই জায়গাতেই ছবিটি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
‘পসিবল লাভ’ উৎসর্গ করা হয়েছে ক্রিস্তফ কিশলোভস্কির ‘ডেকালগ ১০’ -এর প্রতি, যার নৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি হলো—অন্যের জিনিসের প্রতি আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু লি চ্যাং-দংয়ের ছবিতে সেই আকাঙ্ক্ষা শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার প্রশ্ন নয়। আমরা কী চাই, কেন চাই এবং সেই চাওয়ার জন্য সমাজ আমাদের কী মূল্য দিতে বাধ্য করে—ছবিটি ধীরে ধীরে সেই উত্তরের দিকে যায়।
শেষের দিকে একটি দৃশ্যে ক্যামেরা হো-সকের দিকে স্থির থাকে। তার মুখে তখন এমন এক ভাঙন দেখা যায়, যা কোনো সংলাপ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সুল কিয়ং-গু চরিত্রটির এই অসহায়ত্ব খুব সংযতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি কাঁদেন, কিন্তু সেই কান্না ব্যক্তিগত পরাজয়ের চেয়ে বড় কিছু হয়ে ওঠে। মনে হয়, একজন মানুষ নিজের জীবনের ভেতর দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছেন—যে ভবিষ্যৎ তিনি একসময় কল্পনা করেছিলেন, সেটি হয়তো আর তার জন্য অপেক্ষা করছে না।
লি চ্যাং-দংয়ের ‘বারনিং’ ছবিতেও আমরা এমন এক পৃথিবী দেখেছিলাম, যেখানে মানুষের আকাঙ্ক্ষা আর সামাজিক অবস্থানের মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছিল। ‘পসিবল লাভ’ সেই দূরত্বকে আরও ঘনিষ্ঠ জায়গা থেকে দেখে। এখানে রহস্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন। একটি চাকরি হারানো, একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, কিংবা এমন কোনো জিনিসের দিকে তাকিয়ে থাকা যা নিজের পক্ষে কেনা সম্ভব নয়—এই সামান্য ঘটনাগুলোই ধীরে ধীরে একটি সময়ের প্রতিকৃতি তৈরি করে।
সিনেমাটির কোমলতা এখানেই। এটি মানুষের দুর্বলতাকে উপহাস করে না। মি-ওক কিংবা হো-সক কেউই আদর্শ মানুষ নন। তাঁরা ভুল করেন, আকাঙ্ক্ষা করেন, ঈর্ষা করেন, কখনো অন্যের জীবনের দিকে তাকিয়ে নিজের জীবনকে ছোট মনে করেন। কিন্তু ছবিটি তাদের বিচার করে না।
বরং যেন বলে, মানুষকে বোঝার জন্য তার ভুলের দিকে শুধু তাকালে হয় না। দেখতে হয় সে কোন পৃথিবীর মধ্যে দাঁড়িয়ে সেই ভুল করেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









