ইন্টারনেট আমাদের সামনে জ্ঞানের এক অফুরন্ত ভান্ডার খুলে দিয়েছে। সেই ভান্ডার থেকে আমরা কতটা নেব, তা অবশ্য আমাদেরই সিদ্ধান্ত। কেউ সেখানে ঢুকে একটু দেখে চলে আসে, কেউ আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুবে থাকে। লেখক আরএফ কুয়াং দ্বিতীয় দলের মানুষ। নতুন কোনো বিষয় পেলেই তার কৌতূহল জেগে ওঠে। ইতিহাস, দর্শন, সংগীত কিংবা পুরোনো সাহিত্য—সবকিছুর ভেতরেই তিনি খুঁজে বেড়ান গল্পের উপাদান।
কুয়াংয়ের গল্পের শুরু অবশ্য অনেক আগে। তখন তিনি শিশু। ছোট বোনকে ঘুম পাড়ানোর দায়িত্ব তার। একই ঘরে দুই বোন। রাত গভীর হলে তিনি বোনকে শোনাতেন নিজের বানানো গল্প। সেই গল্প থেকেই তৈরি হতো নতুন পৃথিবী, নতুন চরিত্র, নতুন কল্পনার বন্ধু। কুয়াং বলেন, বিশ্ব নির্মাণের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় হয়েছিল রাতের সেই সময়গুলোতেই। এখন সেটিই তার পেশা।
মাত্র ৩০ বছর বয়সেই আরএফ কুয়াং একদিকে লেখক হিসেবে পরিচিত, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার জগতেও তার সমান বিচরণ। তিনি মার্শাল স্কলার হিসেবে অক্সফোর্ডে পড়েছেন এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি শেষ করছেন। বিশের কোঠাতেই প্রকাশ করেছেন ছয়টি বই। তার উপন্যাসের মধ্যে আছে ‘দ্য পপি ওয়ার’ ত্রয়ী, ‘বাবেল’, ‘ইয়েলোফেস’ ও ‘কাটাবাসিস’। তার বইগুলো পাঠকের মধ্যে যেমন জনপ্রিয়, তেমনি বিতর্কও তৈরি করেছে।
কুয়াংয়ের কাছে পড়াশোনা নিছক দায়িত্ব নয়, আনন্দও। তিনি লে গুইন ও গ্যেটের কথা বলেন, জানতে চান অন্যরা মার্কেজ বা দস্তয়েভস্কি পড়ছে কি না। পরের বইয়ের জন্য ব্রাহ্মস, বেটোফেন ও ভাগনারের সংগীত নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গবেষণা করেন। আবার একই মানুষ ‘ওয়ারিয়র ক্যাটস’ কিংবা ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য অডিসি’ নিয়েও সমান উৎসাহী।
নতুন উপন্যাস ‘তাইপেই স্টোরি’ প্রকাশের অপেক্ষায় থাকলেও তিনি ইতিমধ্যে পরের বইয়ের কাজে ডুবে আছেন। সেই বইয়ের গল্প ছড়িয়ে আছে পাঁচটি ভিন্ন ঐতিহাসিক সময়ে। তাই তার গবেষণার শেষ নেই। সামরিক নির্দেশিকা, যুদ্ধক্ষেত্রের ডায়েরি, ইতিহাসের নানা গবেষণাগ্রন্থ—সবই পড়ছেন। কারণ, তার কাছে একটি গল্পের পৃথিবীকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হলে সেই পৃথিবী সম্পর্কে গভীরভাবে জানা দরকার।
তবে লেখালেখির পাশাপাশি আরেকটি কাজকে তিনি খুব গুরুত্ব দেন—শিক্ষকতা।
বর্তমানে ম্যাসাচুসেটসের কলেজ অব দ্য হলি ক্রসে সৃজনশীল লেখার অধ্যাপক কুয়াং। তার কাছে শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, পরিচয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি বলেন, জীবনে লেখক হিসেবে যত দূরেই যান না কেন, পড়ানো চালিয়ে যেতে চান। সাহিত্য, মানবিক বিদ্যা ও সৃজনশীল লেখার শিক্ষা মানুষের শুধু ব্যক্তিগত জীবনকে সমৃদ্ধ করে না; তাকে গণতন্ত্রে অংশ নিতে এবং অন্য মানুষের প্রতি যত্নশীল হতেও শেখায়।
শিক্ষকতার প্রতি এই টান হয়তো তার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই এসেছে। চার বছর বয়সে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর ইংরেজি ভাষা নিয়ে তার অনেক সমস্যা ছিল। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত লাজুক। স্কুলের শিক্ষক ও বিতর্কের প্রশিক্ষক অ্যারন টিমন্স তাকে নিজেকে খুঁজে পেতে সাহায্য করেন।
টিমন্সের সঙ্গে তার সম্পর্ক আজও অটুট। মজার ব্যাপার হলো, হাইস্কুলে পড়ার সময় তার শিক্ষকের অফিসেই পরিচয় হয়েছিল এক নতুন ছাত্রের সঙ্গে, যে স্কুল বদলাতে এসেছিল। সেই তরুণই পরে কুয়াংয়ের স্বামী বেনেট একার্ট-কুয়াং। আর তাদের বিয়েতে দায়িত্ব পালন করেছিলেন সেই শিক্ষক টিমন্স।

কুয়াংয়ের ২০২৫ সালের উপন্যাস ‘কাটাবাসিস’-এর একটি চরিত্র পিটার মারডক যেন তার ব্যক্তিগত জীবনেরই এক প্রতিধ্বনি। চরিত্রটির ক্রোনস রোগ আছে, যা কুয়াংয়ের স্বামীর বাস্তব জীবনের দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত। জীবনের বড় কোনো পরিবর্তন, শোক, হারানো কিংবা অসুস্থতার মুখোমুখি হলে কুয়াং লেখার মধ্য দিয়ে তার সঙ্গে বোঝাপড়া করেন।
তার নতুন বই ‘তাইপেই স্টোরি’-তেও আছে ব্যক্তিগত শোকের ছায়া। উপন্যাসের তরুণী লিলি চেন চীনা-আমেরিকান কলেজছাত্রী। নিজের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংস্কৃতিকে বুঝতে সে তাইপেই যায় ম্যান্ডারিন শেখার জন্য। সেখানে গিয়ে জানতে পারে, তার দাদু মারা গেছেন। কয়েক বছর আগে নিজের দাদুকে হারানোর অভিজ্ঞতা থেকেই কুয়াং চরিত্রটির ভেতরে ঢুকিয়েছেন পারিবারিক গোপন কথা, অপরাধবোধ ও হারিয়ে যাওয়া সুযোগের অনুভূতি।
তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তার লেখার একমাত্র উৎস নয়। তিনি চারপাশের সংস্কৃতি নিয়েও বেশ সতর্ক। দ্রুতগতির অনলাইন বিনোদন তার ভালো লাগে না। একসময় টিকটক ব্যবহার করতেন। পরে মনে হলো, খুব সহজে এক ভিডিও থেকে আরেক ভিডিওতে চলে যাওয়ার অভ্যাস তার মনোযোগ নষ্ট করছে। তাই অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলেন।
কুয়াংয়ের আশঙ্কা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের এমন সব কনটেন্টের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা খুব সহজে বোঝা যায় এবং অল্প সময়েই শেষ করা যায়। ফলে জটিল কোনো ভাবনার সঙ্গে দীর্ঘ সময় থাকার অভ্যাস কমে যাচ্ছে। অথচ তার নিজের বইগুলো ঠিক তার উল্টো। ‘দ্য পপি ওয়ার’, ‘বাবেল’ কিংবা ‘কাটাবাসিস’—সবই দীর্ঘ, তথ্যসমৃদ্ধ এবং নানা স্তরে নির্মিত।
তার বই পড়ার জন্য কেউ কেউ পাঠ্যতালিকাও তৈরি করেছেন। ‘কাটাবাসিস’ পড়তে পাঠকেরা দান্তের ‘ইনফার্নো’, হোমারের ‘অডিসি’, ভার্জিলের ‘এইনিড’ কিংবা ইউরিপিদিসের ‘আলসেস্টিস’ পড়ার পরামর্শ দেন। কুয়াং বিষয়টিকে মজার ও আদুরে বলে মনে করেন। তবে তার বক্তব্য পরিষ্কার—বই পড়ার কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি নেই। পাঠক নিজের মতো করেই বই পড়বেন।
তিনি নিজেও নিজের লেখাকে প্রাচীন মহাকাব্য বা ধ্রুপদি সাহিত্যের সমতুল্য মনে করেন না। বরং সেগুলোর কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। তাঁর ভাষায়, সেটিই তাঁর লেখার লক্ষ্য।
আর একটি বিষয় তিনি স্পষ্ট করে বলেন: জ্ঞান দেখানোর জন্য তিনি লেখেন না। অকারণে লেখাকে কঠিন বা অতিরিক্ত একাডেমিক করাও তাঁর উদ্দেশ্য নয়। বরং পাঠকের কাছে তিনি হতে চান এমন এক ‘নার্ডি বন্ধু’, যে হঠাৎ এসে বলে—‘শোনো, আমি এমন একটা দারুণ জিনিস জেনেছি, তোমাকে সেটা বলতেই হবে।’
লেখক হিসেবে বিপুল সাফল্য এলেও নিজের লেখাকে ঘিরে পাঠকের বিতর্ক অনুসরণ করেন না কুয়াং। কেউ তার বইকে অসাধারণ বলেন, কেউ অতিরিক্ত প্রচার পাওয়া বই বলেন; কেউ বলেন জীবন বদলে দিয়েছে, কেউ আবার বলেন বইয়ে অনেক কিছুই বেশি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এসব আলোচনা থেকে তিনি নিজেকে দূরে রাখেন। তার যুক্তি, এত বিপুল মতামতের ভিড়ে কোনটি সত্যিকার উপকারী সমালোচনা আর কোনটি শুধু পাঠকের ব্যক্তিগত রুচি—তা আলাদা করা কঠিন।
কুয়াংয়ের লেখার গতি নিয়েও বিস্ময়ের কমতি নেই। ২০১৮ সালে ‘দ্য পপি ওয়ার’, পরের বছর ‘দ্য ড্রাগন রিপাবলিক’, ২০২০ সালে ‘দ্য বার্নিং গড’, ২০২২ সালে ‘বাবেল’, ২০২৩ সালে ‘ইয়েলোফেস’ এবং ২০২৫ সালে ‘কাটাবাসিস’—প্রায় নিয়মিত বিরতিতে এসেছে তার বই। অনেকগুলোর পৃষ্ঠা পাঁচশোর বেশি।
কিন্তু এই দ্রুতগতির জীবন এবার বদলাতে চান তিনি। তার মনে হচ্ছে, এত দ্রুত বই লেখা দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সামনে তিনি আরও বড়, জটিল ও গভীর গবেষণানির্ভর কাজ করতে চান। সে জন্য হয়তো একটি বই লিখতে পাঁচ, ছয় কিংবা সাত বছরও লেগে যেতে পারে। তার প্রিয় লেখকেরাও অনেক সময় এক বই থেকে আরেক বইয়ের মাঝখানে এক দশক পর্যন্ত অপেক্ষা করেন।
তরুণ লেখক হিসেবে কুয়াংয়ের কাছে পড়া ও লেখার ভালো করার পরামর্শ চাইলে তিনি তিনটি কথা বলেন—ফোন দূরে রাখুন, শুধু সহজে বোঝা যায় এমন বই পড়বেন না, আর কোনো বই প্রথমবার ভালো না লাগলেই ছেড়ে দেবেন না।
গ্যেটের ‘ফাউস্ট’ পড়তে তার নিজেরই পাঁচবার চেষ্টা করতে হয়েছিল। পরে ডেভিড কনস্ট্যান্টাইনের অনুবাদ হাতে পেয়ে বইটি তার কাছে যেন হঠাৎ খুলে যায়। প্রতিটি লাইন তখন তার কাছে গান গাইতে শুরু করে।
শেষ পর্যন্ত কুয়াংয়ের কাছে পড়া ও লেখার আনন্দ কোনো তাড়াহুড়োর বিষয় নয়। দীর্ঘ একটি অনুচ্ছেদ ধীরে ধীরে পড়া, একটি বাক্যের গঠন লক্ষ করা, শব্দের নির্বাচন বোঝা, একটি অনুভূতিকে ভাষায় কীভাবে ধরা হয়েছে তা আবিষ্কার করা—এসবের মধ্যেই আছে আসল আনন্দ।
তিনি যখন প্রুস্তের দীর্ঘ কোনো বাক্য পড়েন, তখন শুধু ‘কী বলা হয়েছে’ তা নয়, ‘কীভাবে বলা হয়েছে’ সেটিও দেখেন। শব্দের শব্দ, ছন্দ, ছবি, বাক্যের গঠন—সব মিলিয়ে সাহিত্য তার কাছে এক ধরনের ধীর আবিষ্কার।
আরএফ কুয়াংয়ের মতে— ‘আনন্দটা শুধু বই শেষ করার মধ্যে নয়, পড়ার এবং লেখার পুরো পথটুকুর মধ্যেই।’

লেখাটি ভোগ ইন্ডিয়াতে ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত হয়। (www.vogue.in)
পরিচিতি
আর. এফ. কুয়াং একজন চীনা-মার্কিন লেখক ও ঔপন্যাসিক। তার পুরো নাম রেবেকা ফ্যান কুয়াং। তিনি ১৯৯৬ সালে চীনের গুয়াংজু শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরে তার পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে চলে যায়। ছোটবেলা থেকেই ইতিহাস, সাহিত্য ও ভাষার প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়।
কুয়াং ইতিহাস ও যুদ্ধের পটভূমিকে কল্পকাহিনির সঙ্গে মিলিয়ে লেখার জন্য পরিচিত। তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য পপি ওয়ার’ ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয়। বইটি পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং তাকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে। পরে তিনি ‘দ্য ড্রাগন রিপাবলিক’ ও ‘দ্য বার্নিং গড’ লিখে ‘দ্য পপি ওয়ার’ ত্রয়ী সম্পন্ন করেন।
২০২২ সালে প্রকাশিত তার উপন্যাস ‘ব্যাবেল: অর দ্য নেসেসিটি অব ভায়োলেন্স’ তাকে আরও ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। বইটিতে ভাষা, ঔপনিবেশিকতা, ক্ষমতা ও পরিচয়ের মতো বিষয় উঠে এসেছে। ২০২৩ সালে তার উপন্যাস ‘ইয়েলোফেস’ প্রকাশিত হয়, যা লেখালেখির জগৎ, বর্ণবাদ ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে আলোচনা করে।
সাহিত্যে অবদানের জন্য কুয়াং বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তার লেখায় ইতিহাস, রাজনীতি, ভাষা ও সমকালীন সমাজের নানা বিষয় সৃজনশীলভাবে উঠে আসে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









