একটি কণ্ঠ কখনো শুধু গান গায় না, কখনো কখনো সেই কণ্ঠ হয়ে উঠে একটি জনপদের আবেগ, ভালোবাসা ও পরিচয়ের অংশ। জুবিন গার্গ ছিলেন তেমনই এক শিল্পী। অসমিয়া সংগীতের আকাশে তিনি যেমন ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র, তেমনি বাংলা ভাষার শ্রোতাদের কাছেও তার কণ্ঠ ছিল ভীষণ পরিচিত। ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ৫২ বছর বয়সে তার আকস্মিক মৃত্যু থামিয়ে দেয় সেই কণ্ঠ। আজ তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী।
‘ইয়া আলি’ থেকে কোটি শ্রোতার হৃদয়ে
দীর্ঘ ৩৩ বছরের সংগীতজীবনে জুবিন বিভিন্ন ভাষায় হাজার হাজার গান গেয়েছেন। তবে ২০০৬ সালে ইমরান হাশমি অভিনীত ‘গ্যাংস্টার’ সিনেমার ‘ইয়া আলি’ গানটি তাকে উপমহাদেশজুড়ে নতুন করে পরিচিত করে। গানটির সাফল্যের পর বলিউডে একের পর এক কাজের সুযোগ এলেও জুবিন নিজেকে কেবল হিন্দি সিনেমার গায়ক হিসেবে আটকে রাখেননি। বলিউডে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তিনি নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ছিলেন। অসমিয়া গান, লোকসংস্কৃতি ও আঞ্চলিক চলচ্চিত্রকে গুরুত্ব দেওয়াই ছিল তার কাছে বেশি স্বস্তির। সংগীতের পাশাপাশি অভিনয় ও চলচ্চিত্র নির্মাণেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি।
বাংলার প্রতি আলাদা ভালোবাসা
জুবিনের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক ছিল কেবল গান গাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তার ছিল গভীর টান। এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেকেই ‘আধা বাঙালি’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। বাংলা ও আসামের সংস্কৃতির মিল, খাবারের প্রতি ভালোবাসা এবং মানুষের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্কের কথা বলেছিলেন তিনি। বাংলা চলচ্চিত্রেও তার কণ্ঠ পেয়েছে বিশেষ জায়গা। ‘মন মানে না’, ‘পিয়া রে’, ‘বোঝে না সে বোঝে না’, ‘চোখের জলে’সহ বেশ কিছু জনপ্রিয় গানে তার কণ্ঠ শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নেয়।
জনপ্রিয়তার চেয়ে শিকড়ের টান
বলিউডে সাফল্য পাওয়ার পরও একসময় জুবিন সেখান থেকে দূরে সরে যান। কারণ হিসেবে তিনি আঞ্চলিক ভাষার গান ও চলচ্চিত্রে বেশি মনোযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও মাটির সঙ্গে যুক্ত থাকাই ছিল তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি বলিউডের কিছু গানের নকল করার প্রবণতা নিয়েও প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়েছিলেন তিনি। তার বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল—খ্যাতির চেয়ে নিজের সংস্কৃতি ও সৃষ্টিশীল স্বাধীনতাকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন।
শিল্পীর বাইরেও অন্য এক জুবিন
জুবিনের পরিচয় শুধু শিল্পী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবেও ছিল আলাদা। গায়িকা জুন বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে উঠে এসেছে জুবিনের মানবিকতার নানা গল্প। মুম্বাইয়ের তার বাড়িতে কাজের সন্ধানে আসা অনেক অপরিচিত মানুষ থাকতেন। তাদের থাকা-খাওয়ার দায়িত্বও নিতেন তিনি। জুনের স্মৃতিতে, জুবিন ছিলেন সরল, শিশুসুলভ এবং মানুষের জন্য ভাবতেন এমন একজন মানুষ। এই মানবিকতাই হয়তো তাকে শুধু একজন জনপ্রিয় শিল্পী না বানিয়ে মানুষের আপনজন করে তুলেছিল। তার গান যেমন মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে, তেমনি তার ব্যক্তিত্বের গল্পও ছড়িয়ে পড়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
যে কণ্ঠ থেমেও থামেনি
জুবিনের মৃত্যুর পর কেটে গেছে এক বছর। তার অনুপস্থিতি এখনো মেনে নিতে পারেননি অনেক শ্রোতা। আসামে তার স্মরণে আয়োজিত হয়েছে নানা কর্মসূচি, সংগীত পরিবেশন ও স্মরণসভা। তার শেষ চলচ্চিত্র ‘রই রই বিনালে’ও তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আসামে মুক্তি পাচ্ছে। জুবিনের মৃত্যু ঘিরে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়াও চলেছে। ২০২৬ সালের মার্চে সিঙ্গাপুরের স্টেট করোনার তার মৃত্যুকে দুর্ঘটনাজনিত ডুবে মৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করে ফাউল প্লের প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে তার মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে আসামে আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
তবে এসবের বাইরেও জুবিন গার্গের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার গান। আসামের মাটি থেকে বাংলার শ্রোতাদের হৃদয়—তার কণ্ঠ পেরিয়েছে বহু সীমান্ত। তাই এক বছর পরও তার গান থেমে নেই। ‘ইয়া আলি’ হোক কিংবা বাংলা-অসমিয়া কোনো গান—প্রতিটি সুরে তিনি যেন আবার ফিরে আসেন। শিল্পীর জীবন থেমেছে, কিন্তু তার কণ্ঠ এখনো বেঁচে আছে শ্রোতার স্মৃতিতে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









