দ্বিতীয় অ্যালবাম নিয়ে অনেক শিল্পীই তাড়াহুড়ো করে পরে আফসোস করেন। প্রথম অ্যালবামের জন্য বছরের পর বছর ধরে গান জমিয়ে রাখার পর দ্বিতীয়বার সেই মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু ব্রিটিশ রক ব্যান্ড লেড জেপেলিনের গল্পটা ছিল অন্য রকম। ১৯৬৯ সালে নানা বিশৃঙ্খলা, ব্যস্ততা আর সময়ের অভাবের মধ্যে তৈরি হয়েছিল তাদের দ্বিতীয় অ্যালবাম। অথচ সেই অ্যালবামই পরে হার্ড রক সংগীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
নতুন এক সংগীতধারার পথ দেখানো
১৯৬৮ সালের অক্টোবরে মঞ্চে প্রথম দিককার পরিবেশনা দিয়েই আলোচনায় আসে লেড জেপেলিন। সমালোচকদের কেউ কেউ তাদের সংগীত নিয়ে দ্বিধায় থাকলেও শ্রোতারা দ্রুতই ব্যান্ডটির প্রতি আকৃষ্ট হন। মঞ্চে তাদের তীব্র শব্দ, ভারী গিটার আর শক্তিশালী পরিবেশনা ছিল সে সময়ের রকসংগীতে এক নতুন অভিজ্ঞতা।
১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয় ব্যান্ডটির প্রথম অ্যালবাম ‘লেড জেপেলিন’। অ্যালবামটি তাদের সেই প্রবল সংগীতশক্তিকে আরও বিস্তৃত পরিসরে তুলে ধরে। ভারী গিটারের শব্দ, ব্লুজের প্রভাব আর আক্রমণাত্মক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তারা এমন এক সংগীতধারার বিকাশে ভূমিকা রাখে, যা পরে হেভি মেটাল নামে পরিচিতি পায়।
সে সময় সংগীতশিল্পীদের কাছ থেকে অল্প সময়ের ব্যবধানে নতুন অ্যালবাম প্রকাশের প্রত্যাশা করা হতো। ফলে প্রথম অ্যালবামের সাফল্যের পর দীর্ঘ বিরতি নেওয়ার সুযোগ ছিল না। ব্যান্ডটির নেতা ও গিটারবাদক জিমি পেজও সাফল্যের গতি ধরে রাখতে চেয়েছিলেন।
দীর্ঘদিন অন্য শিল্পীদের হয়ে স্টুডিওতে গিটার বাজিয়েছেন পেজ। অবশেষে নিজের পছন্দের সংগীতধারাগুলোকে একত্র করে গড়ে তুলেছিলেন লেড জেপেলিন। ব্যান্ডটির সাফল্য ধরে রাখতে তিনি তাই শুরু থেকেই ব্যস্ত সূচিতে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

হোটেলকক্ষে গান লেখা, এক শহর থেকে অন্য শহরে রেকর্ডিং
১৯৬৯ সালজুড়ে লেড জেপেলিনের ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বারবার যাতায়াত করেছে ব্যান্ডটি। পাশাপাশি কানাডার কয়েকটি শহরেও সংগীত পরিবেশন করেছে তারা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে তাদের পরিচিতি, দর্শকসংখ্যা ও পরিবেশনার পরিসর।
এই ব্যস্ত সফরের মধ্যেই চলছিল দ্বিতীয় অ্যালবামের কাজ। নির্দিষ্ট কোনো স্টুডিওতে বসে দীর্ঘ সময় নিয়ে গান তৈরি করার সুযোগ ছিল না। বিভিন্ন শহরের স্টুডিওতে রেকর্ড করা হয়েছে অ্যালবামের গান। অনেক গান তৈরি হয়েছে সফরের ফাঁকে, কখনো হোটেলকক্ষে বসে।
লেখক বব স্পিটজের লেখা লেড জেপেলিনের জীবনীতে জিমি পেজের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে। সেখানে তিনি সেই সময়ের রেকর্ডিং প্রক্রিয়াকে কার্যত পাগলাটে বলে বর্ণনা করেন। তাঁর কথায়, সময় ছিল না বললেই চলে। লন্ডনে গানের ছন্দের অংশ রেকর্ড করা হয়েছে, নিউইয়র্কে যোগ হয়েছে কণ্ঠ, ভ্যাঙ্কুভারে রেকর্ড করা হয়েছে হারমোনিকা, এরপর মিশ্রণের কাজ করতে আবার ফিরতে হয়েছে নিউইয়র্কে।
একেকটি গানের বিভিন্ন অংশ এভাবে আলাদা শহরে রেকর্ড হওয়ায় পুরো অ্যালবাম তৈরি করা ছিল কঠিন কাজ। সময়ের চাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংগীতের প্রতিটি অংশকে একসঙ্গে মেলানোই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশৃঙ্খলার মধ্যেও তৈরি হলো ‘লেড জেপেলিন টু’
রেকর্ডিংয়ের এমন বিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যান্ডটির উদ্বেগ ছিল। বিভিন্ন স্টুডিওতে তৈরি করা সংগীতের অংশগুলো একত্র করার সময় অ্যালবামে কাজের বিশৃঙ্খলা ও তাড়াহুড়োর ছাপ থেকে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাও ছিল তাদের।
কিন্তু জিমি পেজ ও সাউন্ড প্রকৌশলী এডি ক্রেমার দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় রেকর্ড করা অংশগুলোকে একসূত্রে গেঁথে ফেলেন। ফলে শ্রোতাদের কাছে অ্যালবামটি পৌঁছানোর পর সেই ব্যস্ততা কিংবা চাপের কোনো স্পষ্ট ছাপ শোনা যায়নি।
১৯৬৯ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত হয় ‘লেড জেপেলিন টু’। অ্যালবামটিতে ছিল ‘হোল লটা লাভ’, ‘র্যাম্বল অন’ ও ‘হার্টব্রেকার’-এর মতো গান। প্রতিটি গানেই ব্যান্ডটির শক্তিশালী শব্দ, ব্লুজের প্রভাব এবং নতুন কিছু করার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অ্যালবামটির বিশেষত্ব ছিল শক্তি আর পরীক্ষামূলক সংগীতের এক অদ্ভুত সমন্বয়। একদিকে ছিল ভারী গিটারের তীব্রতা, অন্যদিকে সংগীতের গঠন ও পরিবেশনায় নতুনত্বের চেষ্টা। তাড়াহুড়ো করে তৈরি হলেও অ্যালবামটি যেন ব্যান্ডটির সৃজনশীল শক্তিকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছিল।
এরপরও থামেনি লেড জেপেলিন
দ্বিতীয় অ্যালবামের সাফল্যের পর ব্যান্ডটি কিছুটা ধীরগতিতে কাজ করবে, এমনটা ভাবার সুযোগ খুব একটা ছিল না। প্রথম অ্যালবামের প্রায় নয় মাস পর প্রকাশিত হয়েছিল দ্বিতীয়টি। এরপর তৃতীয় অ্যালবাম ‘লেড জেপেলিন থ্রি’ প্রকাশ করতে তাদের সময় লাগে প্রায় এক বছর। সেটিও পরে ব্যান্ডটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য অ্যালবাম হিসেবে পরিচিতি পায়।

লেড জেপেলিনের দ্বিতীয় অ্যালবামের গল্প তাই শুধু একটি সফল রেকর্ড তৈরির কাহিনি নয়। এটি এমন এক সময়ের গল্প, যখন নিরবচ্ছিন্ন সফর, সীমিত সময় আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও একটি ব্যান্ড নিজেদের সংগীতের ভাষা খুঁজে নিচ্ছিল।
যে অ্যালবামটি তৈরির সময় ব্যান্ডটির সদস্যদের হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল না, সেই অ্যালবামই শেষ পর্যন্ত তাদের সংগীতজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে ওঠে। কখনো কখনো সৃজনশীলতার সেরা প্রকাশ নিখুঁত পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে আসে না; বরং আসে অস্থিরতা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। লেড জেপেলিনের ‘লেড জেপেলিন টু’ তারই এক স্মরণীয় উদাহরণ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









