ইরানের রাজধানী তেহরানে বৈঠকে বসেছেন পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন হামলার হুমকির মধ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতেই তাদের এই সফর। তিনটি দেশই মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান আল সৌদ, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ির সঙ্গেও তাদের আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তেহরানে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। আলোচনার বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কার মধ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংকটবিষয়ক সংস্থার মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির উপপরিচালক আলি ভায়েজের মতে, পরিস্থিতি আবার সংঘাতে গড়ানোর আগেই সমঝোতার পক্ষে থাকা শক্তিগুলোর অবস্থান জোরালো করার চেষ্টা করছে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির দেশগুলো। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ কমানোর মতো বিশ্বাসযোগ্য কোনো প্রস্তাব নিয়ে তারা না এলে আলোচনায় অগ্রগতি সীমিত থাকতে পারে।
আলোচনায় হুতিদের হামলা ও সৌদি নিরাপত্তা
বৈঠকে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। ইরানের সঙ্গে হুতিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করে। ফলে ইয়েমেনের সংঘাত সৌদি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের যুদ্ধবিষয়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ গবেষক আয়েশা সিদ্দিকার মতে, হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির দেশগুলোর সীমিত। তবে ইয়েমেন থেকে হামলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌদি আরব তার মিত্রদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং তাদের কাছ থেকে আরও বেশি সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে।
সিদ্দিকা মনে করেন, সৌদি আরবের মিত্র হলেও তুরস্ক ও পাকিস্তানের পক্ষে ইয়েমেনে সেনা পাঠানো সহজ হবে না। অর্থাৎ, প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকলেও বাস্তবে সামরিক সহযোগিতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তার মতে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের গত সপ্তাহে সৌদি আরব ও ইরান সফরের ধারাবাহিকতায় এবারের কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের মধ্যে ইরানের সঙ্গে স্থলপথে সীমান্ত বাণিজ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে পাকিস্তান।
ইরানের কর্মকর্তারা অবশ্য বৈঠকের আগে বলেছেন, তারা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের দেশগুলোর ভূমিকাকেই অগ্রাধিকার দেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা কতটা সম্ভব?
সৌদি পররাষ্ট্রনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণাকারী উমের করিম মনে করেন, তেহরানের বৈঠক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি কমবে—এমন সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। তার মতে, আলোচনার মূল লক্ষ্য সম্ভবত সৌদি আরবকে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রভাব থেকে রক্ষা করা। একই সঙ্গে তুরস্ক ও পাকিস্তান ইরানকে সমঝোতায় রাজি করানোর চেষ্টা করতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক অচলাবস্থা ভাঙতে ইরানে নতুন হামলার কথা বিবেচনা করছেন বলে জানা গেছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে তেহরান কয়েকটি শর্ত পূরণের দাবি জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো চায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও পণ্য পরিবহন নির্বিঘ্নে আবার শুরু হোক। পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং দেশটির উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পরীক্ষা করতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে চায় ওয়াশিংটন। ইসরায়েল আবার ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়।
অন্যদিকে, ইরান তার দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার চায়। এই অবরোধে দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বন্ধ হয়েছে এবং অধিকাংশ বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি জুনে দুই দেশের মধ্যে সম্মত হওয়া সমঝোতা স্মারকে ফিরে যেতে চায় তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্র এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোয় বড় ধরনের হামলা চালিয়ে অভিযান শেষ করা ছাড়া তার সামনে আরেকটি পথ থাকতে পারে। এমন হামলা হলে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাল্টা আঘাত হানতে পারে। চলমান যুদ্ধের আগের পর্যায়ে আরব দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছিল তেহরান।
এদিকে, হুতিদের হুমকির কথা উল্লেখ করে ২১ অক্টোবর সৌদি আরব থেকে জরুরি নয়—এমন দায়িত্বে থাকা মার্কিন সরকারি কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।
সীমিত সাফল্যের আশঙ্কা
আলোচনা চললেও বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে সৌদি আরবের ক্ষয়ক্ষতি কমানোই হতে পারে তিন দেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তবে ইরানের কৌশলগত অবস্থানে বড় পরিবর্তন না এলে সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হবে।
উমের করিমের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর হাতে ইরানের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ বদলে দেওয়ার মতো প্রভাব নেই। ফলে এসব আলোচনা থেকে বড় কোনো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা সীমিত।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









