কাকের একটি দল অপহরণ করে নিয়ে গেছে ছোট ভাইকে। তাকে উদ্ধারে এক রহস্যময় জঙ্গলে পা রাখে এক কিশোরী। সেই জঙ্গলে রয়েছে কথা বলা প্রাণী, নানা জাদুকরী জীব এবং এক আসন্ন যুদ্ধের ভয়াবহতা। এই কল্পনাময় গল্প নিয়েই তৈরি হয়েছে অ্যানিমেশন সিনেমা ‘ওয়াইল্ডউড’।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যানিমেশন স্টুডিও লাইকার তৈরি সিনেমাটি বড় পর্দায় আনতে সময় লেগেছে ১৬ বছর। নির্মাতাদের দীর্ঘ পরিশ্রম ও সৃজনশীলতার ফসল এই সিনেমা আগামী বছরের অস্কার আসরের অন্যতম সম্ভাবনাময় ছবি হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসে সিনেমাটির প্রিমিয়ারে পরিচালক ট্রাভিস নাইট বলেন, ‘১৬ বছর আগে বারাক ওবামা প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। সময়টা বেশ ভালো ছিল, বন্ধুরা।’
বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘শত শত মানুষ বছরের পর বছর নিজেদের সময় ও শ্রম দিয়েছেন। হাতের কাজ এবং কল্পনাশক্তি কাজে লাগিয়ে সবচেয়ে সুন্দর গল্পটি বলার চেষ্টা করেছেন তারা। এই কারণেই সিনেমাটির জন্ম।’

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যানিমেশন স্টুডিও লাইকার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ট্রাভিস নাইটের মতে, কম্পিউটার দিয়ে মানুষের এই সৃজনশীলতার পুরোপুরি বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও তিনি হাতে তৈরি স্থিরচিত্রভিত্তিক অ্যানিমেশন বা স্টপ-মোশন পদ্ধতির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
এই পদ্ধতিতে ছোট ছোট বাস্তব বস্তু বা পুতুলের অবস্থান সামান্য পরিবর্তন করে একেকটি স্থিরচিত্র ধারণ করা হয়। পরে ছবিগুলো ধারাবাহিকভাবে চালালে চলমান দৃশ্যের অনুভূতি তৈরি হয়।
নাইট বলেন, ‘এই সিনেমা মানুষের সৃজনশীলতা, শিল্পকর্ম ও প্রচেষ্টার এক বড় উদ্যাপন। কম্পিউটার মানুষের অভিজ্ঞতার অনুকরণ করার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু কম্পিউটার কখনো কাউকে হারানোর বেদনা অনুভব করেনি, আনন্দ পায়নি, প্রেমে পড়েনি কিংবা হৃদয় ভাঙার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়নি।’
কল্পনার জগতে দুই ভাইবোনের গল্প
‘ওয়াইল্ডউড’ সিনেমার মূল চরিত্র প্রু ম্যাককিল। তার কণ্ঠ দিয়েছেন পেটন এলিজাবেথ লি। প্রুর ছোট ভাইকে একদল কাক অপহরণ করে নিয়ে যায় ‘ইমপাসেবল ওয়াইল্ডারনেস’ নামের এক রহস্যময় জঙ্গলে। যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন অঙ্গরাজ্যের পোর্টল্যান্ড শহরের বাইরের এই বন সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে থাকা এক জাদুকরী জগৎ।
বন্ধু কার্টিসকে সঙ্গে নিয়ে ভাইকে উদ্ধারে বের হয় প্রু। কার্টিসের কণ্ঠ দিয়েছেন জ্যাকব ট্রেম্বলে। অভিযানে তারা এমন এক জগতের সন্ধান পায়, যেখানে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও শোককে ঘিরে বিরোধ তৈরি হয়েছে। সেই বিরোধ যেকোনো সময় বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
পরিচালক ট্রাভিস নাইট বলেন, ‘এটি বিশাল পরিসরের একটি কল্পনানির্ভর গল্প। তবে এর পাশাপাশি মানুষের জীবনের পরিণত কিছু বিষয় এবং গভীর আবেগও তুলে ধরা হয়েছে, যেগুলোর মুখোমুখি জীবনের কোনো না কোনো সময়ে সবাইকে হতে হয়।’
এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পেটন এলিজাবেথ লি বলেন, প্রুর যাত্রার সঙ্গে নিজের কৈশোরের কিছু অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পেয়েছেন তিনি। মজা করে তিনি বলেন, ‘আমি অবশ্য কোনো জাদুকরী জঙ্গলে যাইনি।’ তবে কিশোর বয়সে নিজেকে অনেক পরিণত মনে করা এবং পৃথিবী সম্পর্কে নিজের ধারণা হঠাৎ প্রশ্নের মুখে পড়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গে তিনি একাত্মতা অনুভব করেন।
জ্যাকব ট্রেম্বলও তার চরিত্র কার্টিসের সঙ্গে নিজের মিল খুঁজে পেয়েছেন। কার্টিস তার পছন্দের কমিক বই ও ভিডিও গেমের চরিত্রগুলোর মতো সাহসী হওয়ার চেষ্টা করে।
সিনেমাটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন অ্যাঞ্জেলা বাসেট, ক্যারি মুলিগান, মাহেরশালা আলী ও আওকোয়াফিনার মতো তারকারা। অভিনয়শিল্পীদের কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের অঙ্গভঙ্গিও ধারণ করা হয়েছে। পরে অ্যানিমেশনশিল্পীরা সেসব অঙ্গভঙ্গি চরিত্রগুলোর চলাফেরায় যুক্ত করেছেন।
প্রযুক্তিতে নতুন মাইলফলক
অ্যানিমেশন সুপারভাইজার ব্র্যাড শিফের মতে, চরিত্রগুলোর মুখের অভিব্যক্তি এবং নানা প্রাণীর উপস্থিতির দিক থেকে ‘ওয়াইল্ডউড’ স্টুডিওটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি সিনেমাই পরবর্তী সিনেমার জন্য গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।’ কয়েক বছর আগেও মুখের অভিব্যক্তির এত সূক্ষ্ম পরিবর্তন ফুটিয়ে তোলা সম্ভব ছিল না বলে জানান তিনি।
কলিন মেলয়ের একই নামের বই অবলম্বনে তৈরি হয়েছে সিনেমাটি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন অঙ্গরাজ্যের পোর্টল্যান্ড শহরের প্রতি একধরনের শ্রদ্ধার্ঘ্য। এই শহরেই অবস্থিত লাইকা স্টুডিও।
পরিচালক ট্রাভিস নাইট পোর্টল্যান্ডে বসবাস করেন। তিনি বলেন, ‘এটি খুব নির্দিষ্ট একটি জায়গার গল্প। কোনো কিছুকে যত বেশি নির্দিষ্ট ও ঘনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা যায়, শেষ পর্যন্ত তা তত বেশি মানুষের কাছে সর্বজনীন হয়ে ওঠে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









