২০০৮ সালের জানুয়ারি। লস অ্যাঞ্জেলেসের ইউনিভার্সাল সিটির কাছাকাছি একটি ইন-এন-আউট বার্গারের দোকান। টেবিলে বসে আছেন আঠারো বছরের এক তরুণী—টেলর সুইফট। তার সামনে বার্গার, পাশে চকোলেট শেক। বাইরে থেকে দেখলে তাকে আলাদা করে চেনার বিশেষ কারণ নেই। তখনো তিনি সেই বৈশ্বিক পপ-সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেননি, যাঁকে ঘিরে ভবিষ্যতে সংগীত, সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই তৈরি হবে এক বিশাল আলোড়ন।
সেদিন এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলেছিল আমাদের কথোপকথন। মাঝখানে মাত্র একজন তার কাছে ছবি তোলার অনুরোধ নিয়ে এসেছিল। আজকের বাস্তবতায় ঘটনাটি প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হয়।
টেলর তখন তার প্রথম অ্যালবাম নিয়ে ধীরে ধীরে সাফল্যের দিকে এগোচ্ছেন। কান্ট্রি সংগীতের শ্রোতাদের মধ্যে পরিচিতি তৈরি হয়েছে, আর ‘টিয়ারড্রপস অন মাই গিটার’ পপ রেডিওতেও জায়গা করে নিতে শুরু করেছে। কিন্তু সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা তখনো কারও জানা নেই।
‘আপনার দুটি গান একই সময়ে চার্টে ভালো করছে। ‘আওর সং’ কান্ট্রি চার্টে শীর্ষে, আর ‘টিয়ারড্রপস অন মাই গিটার’ পপ শ্রোতাদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে। কোন গানটি পরিবেশন করবেন, তা কীভাবে ঠিক করেন?’
টেলর সুইফট: যেটি চার্টে সবচেয়ে ওপরে থাকে, সাধারণত সেটিই বেছে নিই। ‘আওর সং’ তখন কান্ট্রি চার্টে এক নম্বরে ছিল। তাই সিদ্ধান্তটা কঠিন ছিল না। গানটি আমার কাছে বিশেষ, কারণ এটি আমি নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় নিজেই লিখেছিলাম। স্কুলের একটি অনুষ্ঠানের জন্য লেখা সেই গান যে একদিন আমার প্রথম নম্বর ওয়ান হিট হবে, তা কখনো কল্পনাও করিনি।
আপনার গান লেখার ক্ষমতা নিয়ে অনেকের সংশয় থাকতে পারে, বিশেষ করে আপনার বয়সের কারণে। কিন্তু ‘আওর সং’ -এর মতো গান শুনলে সেই সংশয় রাখা কঠিন।
টেলর সুইফট: এ জন্য আমি কৃতজ্ঞ। ন্যাশভিলের গীতিকারদের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়া আমার কাছে সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ বছর তাঁদের ভোটে একটি পুরস্কারও পেয়েছি। আর নিজের লেখা গান দিয়ে প্রথমবার এক নম্বরে পৌঁছানো—এটা আমার কাছে আরও বিশেষ কিছু।
আপনার গানগুলোর মধ্যে কৈশোরের অভিজ্ঞতা খুব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ‘দ্য আউটসাইডার’ গানটি তো লিখেছিলেন মাত্র বারো বছর বয়সে।
টেলর সুইফট: হ্যাঁ। স্কুলে নিজেকে বাইরের মানুষ মনে হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই গানটি লিখেছিলাম। করিডর দিয়ে হাঁটার সময় চারপাশে এত মুখ দেখা, অথচ কার সঙ্গে কথা বলব তা জানি না—বারো বছর বয়সে এই অনুভূতিটা খুব ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। আসলে বয়স বাড়লেও এমন অনুভূতি পুরোপুরি চলে যায় না। অনেকে জানতে চান, এত কম বয়সে কীভাবে আমি রেকর্ড কোম্পানিগুলোর দরজায় গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস পেয়েছিলাম। আমার মনে হয়, স্কুলে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অভিজ্ঞতা আমাকে প্রস্তুত করেছিল। সংগীতশিল্পের মানুষ অন্তত ভদ্রভাবে না বলতে জানেন! স্কুলে সব সময় সেই সৌজন্য পাওয়া যায় না।
তাহলে কি স্কুলে খুব একটা জনপ্রিয় ছিলেন না?
টেলর সুইফট : আমি অন্যদের মতো ছিলাম না। আমার বয়সী অনেকেই তখন সপ্তাহান্তে পার্টিতে যেত, বন্ধুদের সঙ্গে অন্য রকম সময় কাটাত। আর আমি যেতাম গীতিকারদের আসরে, গিটার বাজাতাম, ছোট ছোট অনুষ্ঠানে গান গাইতাম। আমার কাছে সংগীতই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বন্ধুদের সঙ্গে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তবে এখন ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, সেই অভিজ্ঞতাগুলো আমার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। যদি স্কুলে খুব জনপ্রিয় হতাম, হয়তো ছোট শহর ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার তাগিদ এতটা অনুভব করতাম না।

আপনার পরিবার পেনসিলভানিয়া ছেড়ে ন্যাশভিলে চলে এসেছিল আপনার সংগীতের স্বপ্নকে বাস্তব করার জন্য। সেই সিদ্ধান্তের শুরুটা কীভাবে?
টেলর সুইফট: ছোটবেলা থেকেই আমি ন্যাশভিলে যেতে চাইতাম। ফেইথ হিল, শানিয়া টোয়েন কিংবা ডিক্সি চিকসের জীবন নিয়ে অনুষ্ঠান দেখতাম। তাদের গল্পে বারবার ন্যাশভিলের কথা আসত। আমার মনে হয়েছিল, সংগীতশিল্পী হতে হলে আমাকে সেখানেই যেতে হবে।
এগারো বছর বয়সে মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে প্রথমবার ন্যাশভিলে যাই। হাতে ছিল কারাওকে গান দিয়ে বানানো একটি ডেমো সিডি। মাকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে আমি মিউজিক রোর একের পর এক অফিসে ঢুকতাম। বলতাম, আমার নাম টেলর, বয়স এগারো, আমি একটি রেকর্ড চুক্তি চাই। কেউ তখন আমাকে চুক্তি দেয়নি। কিন্তু বাড়ি ফিরে আমার মনে হয়েছিল, আমাকে অন্য কিছু করতে হবে। শুধু গান গাইলেই হবে না, নিজের গানও লিখতে হবে।
এরপর গিটার শেখা, গান লেখা, নিয়মিত অনুশীলন—সবকিছু আরও মন দিয়ে শুরু করি। আমার বাবা-মা আমার স্বপ্নকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁদের সমর্থন ছাড়া এত দূর আসা সম্ভব হতো না।
আপনি প্রথমে আরসিএ-র সঙ্গে ডেভেলপমেন্ট চুক্তি করেছিলেন। পরে সেই চুক্তি ছেড়ে নতুন একটি রেকর্ড লেবেলে যোগ দেন। সিদ্ধান্তটি কি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল?
টেলর সুইফট: অবশ্যই। আরসিএ ছিল বড় প্রতিষ্ঠান। তারা আমাকে সুযোগ দিয়েছিল, সে জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু একসময় বুঝতে পারলাম, আমাকে অন্য পথ খুঁজতে হবে। আমি নিজের লেখা গান নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলাম। এমন একটি জায়গা দরকার ছিল, যেখানে আমার সংগীতের সিদ্ধান্তগুলোতে আমার নিজেরও ভূমিকা থাকবে। পরে স্কট বোরচেটার সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি তখন নিজের নতুন রেকর্ড লেবেল গড়ে তুলছিলেন। সেখানে কর্মী ছিল মাত্র দশজন। অফিসে ঠিকমতো আসবাবপত্রও ছিল না। আমার প্রথম সিঙ্গেল রেডিও স্টেশনে পাঠানোর সময় আমরা নিজেরাই সিডি খামে ভরেছিলাম। মা-ও সঙ্গে ছিলেন। ব্যাপারটা ছিল একেবারে শূন্য থেকে শুরু করার মতো।
আপনার সাফল্য কি কান্ট্রি সংগীতের জগতে নতুন শিল্পীদের জন্য কোনো দরজা খুলে দিতে পারে বলে মনে করেন?
টেলর সুইফট: আমি চাই, কান্ট্রি সংগীত আরও বড় শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাক। মানুষ যেন শুধু একটি নির্দিষ্ট সংগীতধারায় কোনো শিল্পীকে বিচার না করে। আমি চাই, বিভিন্ন জায়গার মানুষ কান্ট্রি সংগীত শুনুক, ভালোবাসুক। আমার অভিজ্ঞতা থেকে যদি অন্য কোনো তরুণ শিল্পী নিজের গান লিখতে, নিজের শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি করতে উৎসাহ পায়, তাহলে সেটাই হবে বড় প্রাপ্তি। আপনার গানগুলো এত ব্যক্তিগত যে শ্রোতারা সহজেই সেগুলোর সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে নিতে পারেন। আমি গান লেখার সময় নিজের অনুভূতিগুলো আড়াল করতে চাই না। ছোট ছোট ঘটনা, মানুষের নাম, নির্দিষ্ট কোনো স্মৃতি—যা কিছু আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো গানেও জায়গা পায়। আমার কণ্ঠস্বর হয়তো সংগীতজগতের সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠ নয়। কিন্তু আমি যা অনুভব করি, সেটাই লেখার চেষ্টা করি।
আপনার গানের ভাষাকে অনেকে কথোপকথনের মতো বলে থাকেন। এটা আমার খুব ভালো লাগে। আমি আসলে গান গাই কথার মতো করে। কারণ আমার গানগুলোও অনেক সময় কথোপকথনের মতো তৈরি হয়। বিশেষ করে ‘আওর সং’-এ এই ব্যাপারটা খুব স্পষ্ট।
আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এত গান লেখেন—তাতে কি কখনো মনে হয়, একসময় লেখার বিষয় ফুরিয়ে যাবে?
টেলর সুইফট: না। মানুষের অভিজ্ঞতা তো শুধু প্রেমের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বন্ধুত্ব, বিচ্ছেদ, ভুল বোঝাবুঝি, প্রত্যাখ্যান—এসব নিয়েও গান লেখা যায়। এমনকি কোনো বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়ার অভিজ্ঞতাকেও কখনো প্রেমের সম্পর্কের বিচ্ছেদের মতো মনে হতে পারে। অনুভূতির ভাষা অনেক সময় ঘটনার পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।

আপনি কি কখনো এই বিপুল সাফল্যের চাপে নিজেকে সামলাতে না পারার অনুভূতি পান?
টেলর সুইফট: অবশ্যই। আমি তো স্বাভাবিক একজন মানুষ। কখনো কখনো মনে হয়, সবকিছু একটু থামিয়ে নিই। নিজের জন্য কয়েক মিনিট সময় নিই। তারপর আবার কাজে ফিরে যাই। আগামী বিশ বছরও আমি এই সংগীতজগতে থাকতে চাই। কিন্তু শুধু ইচ্ছা করলেই তা সম্ভব হবে না। নিজের ভবিষ্যৎ নিজের হাতে রাখতে হলে নিজের ক্যারিয়ার সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সব সিদ্ধান্ত সহজ হবে না, সব সময় সেগুলো নিতে ভালোও লাগবে না। তবু দায়িত্বটা নিজেরই।
তাহলে আপনার কাছে সাফল্যের অর্থ কী?
টেলর সুইফট: এখনো অনেক কিছু বাকি আছে। আজ আমি যতটুকু জানি, এক বছর পর হয়তো তার চেয়ে অনেক বেশি জানব। এখনো এমন অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছানো বাকি, যারা আমার গান শোনেনি। সামনে কী আছে, তা জানি না। কিন্তু সেই অজানাটাই আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
------
কথোপকথনের শেষ দিকে টেলর আবার ফিরে যান নিজের বার্গার আর চকোলেট শেকের কাছে। তখনো তার সামনে দীর্ঘ পথ। প্রথম অ্যালবামের সাফল্য তাকে পরিচিতি দিয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যতের বিশাল জনপ্রিয়তার কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। তবু তাঁর কথায় একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল— তিনি শুধু একটি হিট গান বা একটি সফল অ্যালবাম চান না। তিনি নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চান, নিজের গান লিখে, নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে।
সেদিন ইন-এন-আউটের ছোট্ট টেবিলে বসে আঠারো বছরের টেলর সুইফট যে কথাটি বলেছিলেন—তিনি আগামী বিশ বছরও এই সংগীতজগতে থাকতে চান—দুই দশক পর সেই উচ্চারণের তাৎপর্য অন্য রকম হয়ে ওঠে। তখন সেটি ছিল এক তরুণ শিল্পীর উচ্চাকাঙ্ক্ষা। আজ তা সুইফটের দীর্ঘ সংগীতযাত্রার এক অদ্ভুত ভবিষ্যদ্বাণী।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









