যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে। আগামী ৩ নভেম্বরের এই নির্বাচন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলের বাকি দুই বছর এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন, ভোটারদের মনোভাব, জনমত জরিপ এবং দুই দলের নির্বাচনী প্রচারের ওপর।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা, মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর শঙ্কায় রিপাবলিকানরা
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে দলটির মধ্যে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীনদের দুর্বল অবস্থান কাজে লাগিয়ে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ার আশা করছে বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টি।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এ নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটিতে এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট হবে। বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে রিপাবলিকানদের হাতে। নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দুই বছর কতটা নির্বিঘ্নে কাটবে।
জনপ্রিয়তায় পিছিয়ে ট্রাম্প
দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতে ট্রাম্পের জনসমর্থন ৫০ শতাংশের কিছু বেশি থাকলেও দ্রুত তা কমে আসে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে তার জনপ্রিয়তা প্রায় ৩৭ শতাংশে নেমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা কমে গেলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার দলের প্রার্থীদেরও এর প্রভাব মোকাবিলা করতে হয়। অতীতের নির্বাচনগুলোতেও দেখা গেছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারায়।
১৯৩৪ সাল থেকে পাওয়া নির্বাচনী তথ্য অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল গড়ে ২৭টি আসন হারিয়েছে। ২৩টি নির্বাচনের মধ্যে মাত্র তিনবার ক্ষমতাসীন দল আসন বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে বর্তমানে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সামান্য। দলটির রয়েছে ২১৮টি আসন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় আসনের চেয়ে তাদের হাতে বাড়তি আসন কার্যত নেই।
নির্বাচনী বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদের ১৮টি আসনে দুই দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি আসন বর্তমানে রিপাবলিকানদের দখলে এবং চারটি ডেমোক্র্যাটদের।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন ৩৬টি আসন রয়েছে। এসব আসনে প্রত্যাশিত ফল পেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে বড় ধরনের সাফল্য ছাড়াও প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে দলটি।
সিনেটে লড়াই আরও কঠিন
প্রতিনিধি পরিষদের তুলনায় সিনেটে রিপাবলিকানদের অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী। ১০০ সদস্যের সিনেটে দলটির আসন ৫৩টি। ডেমোক্র্যাটদের রয়েছে ৪৫টি এবং তাদের সঙ্গে ভোট দেন দুজন স্বতন্ত্র সিনেটর।
এবারের নির্বাচনে সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হবে। এর মধ্যে সাতটি আসনে দুই দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব আসনের ছয়টিই বর্তমানে রিপাবলিকানদের দখলে।
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত ৫১টি আসন নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে মিশিগান, আলাস্কা, আইওয়া ও ওহাইওর মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে জয় পাওয়া তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
টেক্সাসেও ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সেখানে সাবেক শিক্ষক জেমস তালারিকো রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি জয়ী হলে ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবারের মতো টেক্সাস থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ জীবনযাত্রার ব্যয়
নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে অসন্তোষ রয়ে গেছে।
এর পাশাপাশি ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতিও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম বেড়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত আগস্টে পরিচালিত এক জনমত জরিপে ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা ইরান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্পের ভূমিকার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্যসেবা ও অভিবাসন নীতিও ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা স্বাস্থ্যবিমার উচ্চ ব্যয় এবং চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলোকে নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্ব দিচ্ছেন। অন্যদিকে, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও অবৈধ অভিবাসন ঠেকানোর সাফল্য তুলে ধরছে রিপাবলিকানরা।
অর্থের দিক থেকে এগিয়ে রিপাবলিকানরা
জনমত জরিপে পিছিয়ে থাকলেও নির্বাচনী প্রচারে অর্থের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে রিপাবলিকান পার্টি। অক্টোবরের মাঝামাঝি রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর হাতে প্রায় ৩২০ মিলিয়ন ডলার নগদ অর্থ ছিল। বিপরীতে ডেমোক্র্যাটদের হাতে ছিল ২৩০ মিলিয়ন ডলারের কিছু কম।
এ ছাড়া ট্রাম্পের রাজনৈতিক আন্দোলন ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ম্যাগা ইনকরপোরেটেডের তহবিলেও ১৬০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ রয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাডইমপ্যাক্টের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থের রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় করেছে রিপাবলিকানরা।
নির্বাচনের আগে এই বিপুল অর্থের প্রচার ভোটারদের মনোভাব ও ভোটদানের হার পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে ট্রাম্পের আইন প্রণয়ন ও নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। আর রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে মেয়াদের বাকি সময়ে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন ট্রাম্প।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে আলোচনা জোরালো হবে। কারণ, সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কারণে ট্রাম্প তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









