উল্টাপুর গ্রামের একটাই পরিচয়—এখানে সবকিছুই যেন একটু উল্টো! কেউ জুতা পরে পুকুরে নামে, কেউ আবার ছাতা নিয়ে রোদে হাঁটে। তাই গ্রামের উল্টো রথের মেলার খ্যাতিও চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আশপাশের গ্রামের মানুষ রথ দেখতে যতটা আসে, তার চেয়েও বেশি আসে হাসতে।
এবারের রথযাত্রার প্রধান আয়োজক ছিলেন গদাই কাকা। তিনি গম্ভীর মুখে ঘোষণা দিলেন, —“এবারের উল্টো রথ হবে স্মরণীয়!”লোকজন একে অন্যের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। কারণ গদাই কাকা যখনই এমন কথা বলেন, তখনই কোনো না কোনো কাণ্ড ঘটেই যায়।সকাল থেকেই রথ ফুল, রঙিন কাগজ আর কলাগাছ দিয়ে সাজানো হলো। ঢাকের তালে তালে চারদিকে উৎসবের আমেজ। গ্রামের সবচেয়ে দুষ্টু ছাগল ‘কালু’ও ভিড়ের মধ্যে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে।
অবশেষে রথ টানার সময় এল।
গদাই কাকা হাত তুলে বললেন, —“সবাই প্রস্তুত? এক... দুই... তিন... টানো!”
সবাই প্রাণপণে দড়ি টানল। কিন্তু রথ একটুও নড়ল না।
আরও জোরে টানা হলো। তবুও রথ একই জায়গায়।
শেষে দেখা গেল আসল রহস্য! গ্রামের আনমনা পটল রথের দড়ি বেঁধেছে পাশের বিশাল বটগাছে!
মুহূর্তেই চারদিকে হাসির রোল পড়ে গেল। একজন বলল, —“রথ না চলুক, গাছটা যদি হেঁটে আসে!”
দড়ি ঠিক করে আবার টান শুরু হলো।
এবার রথ চলল ঠিকই, কিন্তু এত জোরে যে সামনে ঢাক বাজানো ভোলা ভয়ে লাফ দিয়ে রথের ওপর উঠে পড়ল। সে ঢাক বাজাচ্ছে, আর সবাই ভাবছে এটাই বুঝি অনুষ্ঠানের নতুন আকর্ষণ!
ঠিক তখনই কালু ছাগল কোথা থেকে ফুলের মালা মুখে নিয়ে রথের সামনে এসে দাঁড়াল। সবাই থেমে গেল।
একদল বাচ্চা চিৎকার করে উঠল, —“রাস্তা ছাড়ো! প্রধান অতিথি এসেছেন!”
মনে হলো ছাগলটাও যেন ব্যাপারটা বুঝেছে। সে গম্ভীর ভঙ্গিতে কয়েক পা এগিয়ে আবার হঠাৎ দৌড় দিল। তার পেছনে ছুটল বাচ্চারা, তাদের পেছনে বড়রা। কিছুক্ষণের মধ্যেই রথের শোভাযাত্রার চেয়ে ছাগলের শোভাযাত্রাই বড় হয়ে গেল!
এদিকে গ্রামের ফটোগ্রাফার হরিদাস সবাইকে দাঁড় করিয়ে বললেন, —“একটু হাসুন, ছবি তুলছি!”
সবাই সুন্দর করে দাঁড়াল।
ছবি তোলার পর দেখা গেল, ক্যামেরার ঢাকনাই খোলা হয়নি!
হরিদাস মাথা চুলকে বললেন, —“তা হলে এতক্ষণ আমি কার ছবি তুললাম?”
হাসতে হাসতে অনেকের চোখে পানি এসে গেল।
অবশেষে আবার ছবি তোলা হলো। কিন্তু এবার ক্যামেরা উল্টো ধরে ফেললেন তিনি। পরে ছবি দেখে মনে হলো রথ আকাশে চলছে, আর মানুষ মাটির বদলে আকাশে দাঁড়িয়ে আছে!
গদাই কাকা ছবিটা দেখে গম্ভীর মুখে বললেন, —“এটাই তো উল্টো রথের আসল ছবি!”
সন্ধ্যায় মেলা শেষে পুরস্কার দেওয়ার সময় সবাই একবাক্যে সিদ্ধান্ত নিল—আজকের সেরা আকর্ষণ রথ নয়, ছাগল কালু।
তার গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দেওয়া হলো। পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হলো এক ঝুড়ি কলা। কিন্তু কালু কলা না খেয়ে মালার ফুলই চিবাতে শুরু করল!
সেই দৃশ্য দেখে আবারও হাসির ঢেউ উঠল পুরো মেলায়।
এরপর থেকে উল্টাপুরে একটি কথা খুব জনপ্রিয় হয়ে গেল—
“উল্টো রথের দিনে ভুল না হলে মেলা জমে না, আর একটু হাসি না হলে উৎসব পূর্ণ হয় না!”
লেখক : বিচিত্র কুমার


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









